যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা “বন্ধ” বলে, কিন্তু বিস্তারিত কিছু না জানালে ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যকার উত্তেজনা আরও তীব্র হয়। গত কয়েক মাস ধরে ক্যারিবীয় এলাকায় ব্যাপক সামরিক মোতায়েনের পটভূমিতে এই ঘোষণাটি এসেছে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের তরফে ট্রাম্পের মন্তব্যকে “উপনিবেশবাদের হুমকি” হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরো আগেই সতর্ক করেছেন যে, ওয়াশিংটন এ ধরনের দাবি যুদ্ধের বাধ্যতামূলক কারণ বানানোর চেষ্টা করছে। কারাকাস কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও ব্যাপক সামরিক মহড়া চালাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সেপ্টেম্বরে সামুদ্রিক জাহাজে আঘাত করে, সেই কর্মজটিলতাকে যুক্তি করে বলেছে এগুলো ড্রাগ বহনকারী নৌকা ছিল; তবে তৎপরতায় কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ওই হামলায় অন্তত ৮৩ জন নিহত হওয়ার খবর আছে। পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন ‘কার্টেল দে লস সোলেস’কে (Cartel de los Soles) বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে এবং এটিকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এই পদক্ষেপকে ট্রাম্প প্রশাসন ড্রাগ পাচাররোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আখ্যা দিলেও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মাদুরোকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রস্তুতি হওয়ার আশঙ্কা জাগাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে কিছু বিচারনিষ্ঠ আইনজীবী ও সেনাতন্ত্রের সমালোচক এ ধরনের হামলাকে সংবিধানবিরোধী এবং আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপারে স্পষ্ট অতিরিক্ত বলবৎ হিসেবে দেখেন।
ট্রাম্পের শাসনামলে কারাকাসের বিরুদ্ধে কড়া একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—তেল সংক্রান্ত রিয়ায় বিচ্যুতির সাবেক সিদ্ধান্ত বাতিল, ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং মাদুরোর গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কার দ্বিগুণ করে ৫০ মিলিয়ন ডলারে তোলা ইত্যাদি। সেনা মোতায়েনের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম অ্যারিয়ার ক্যারিয়ার এসএসএল গেরাল্ড আর ফোর্ড, যুদ্ধজাহাজ, হাজার হাজার সেনা ও এফ-৩৫ জেট।
আইনি দিক থেকে এসব কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন প্রেসিডেন্ট এককভাবে এ ধরনের আক্রমণ আরোপ করতে পারবেন না—কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। কিছু আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ একে “গैरকানুনে ঘাতক অস্ত্রপ্রয়োগ” বলেও মন্তব্য করেছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের কর্মকে আইনসম্মত দাবি করেছেন।
মাদুরো সরকার ওই ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। মাদুরো বারবার দরবারে শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন—“যুদ্ধ নয়, শান্তি” বলে জনসমক্ষে কথা বলে আসছেন—কিন্তু একই সঙ্গে তিনি দেশ রক্ষণে শক্ত অবস্থানও তুলে ধরেছেন এবং সামরিক র্যালিতে বলছেন তারা “অবImperialিস্ট হুমকির বিরুদ্ধে” লড়বে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন ট্রাম্পের কূটনৈতিক ও সামরিক মনোভাবের একটি বড় চালিকা শক্তি হলো ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সঞ্চয়; দেশটির প্রমাণিত তেল মজুদ বিশ্বের সর্ববৃহৎ একটিকে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয় কারাকাসকে ড্রাগ-সংক্রান্ত চক্র থেকে সরাতে কাজ করা হচ্ছে, তবু অনেকেই এটিকে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের রূপ বলছেন—বিশেষত রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষিতে।
ড্রাগ সমস্যাকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্ত করার ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা বিরোধিতাও পেয়েছে: উত্তরাধিকারী ড্রাগ, বিশেষত ফেন্টানাইলের চূড়ান্ত উৎস মেক্সিকোতে রয়েছে এবং মাদক যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায় তা ভূমি সীমানার মাধ্যমে। ভেনেজুয়েলা ফেন্টানাইল সংকটের প্রধান উৎস নয়—এটাই ইউএস ডিইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য বলছে—তবে কয়েকটি কোকেন-ট্রানজিট ঘটনার ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার অংশীদারিত্ব আছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। ফরাসি উপ–পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জি-৭ বৈঠকে, ক্যানাডায় ট্রাম্পের নীতিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেছিলেন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ও ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা নরম ভাষায় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে নিশানা করেছে। রাশিয়া ও চীনও কঠোর সমালোচনা করেছে এবং ভেনেজুয়েলার পক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন জানিয়েছে।
অভ্যন্তরীণ যুক্তরাষ্ট্রেও পরিস্থিতিটি বিভক্ত করেছে। মাগা-শিবিরের একাংশ বিদেশি সংঘাতে দীর্ঘস্থায়ী অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে হলেও, ট্রাম্প ও তার নিরাপত্তা আশেপাশের কিছু নেতা—বিশেষত যারা কঠোর অবস্থানের সমর্থক—ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কঠোর নীতিকে সমর্থন করছেন। নীতিনির্ধারণকারীদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও জনমত যুদ্ধের ঝুঁকি ও রাজনৈতিক ফলাফলের দিক থেকে গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প বড় আকারের অধিষ্ঠান বা অধিকতর দখল চায় না বলে মনে থাকলেও, “উল্লেখযোগ্য দৃশ্যমান তৎপরতা”—যেমন লক্ষ্যভিত্তিক আঘাত বা সামরিক প্রদর্শনী—রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে এবং তা বিপুল ঝুঁকি তৈরি করবে। সামরিক অপারেশন যেমন আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াবে, তেমনি মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত জটিলতাও বাড়বে।
সংক্ষেপে, ট্রাম্পের ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার ওপর আক্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বেড়েছে; পরিস্থিতি কূটনৈতিক, আইনি ও সামরিকভাবে অত্যন্ত জটিল। যে কোনও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আইনগত বৈধতা ও নৈতিকতা এবং এর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
















