শৌচাগার নির্মাণে বিপুল অগ্রগতি, কিন্তু আচরণগত ও সাংস্কৃতিক বাধাই রয়ে গেছে সবচেয়ে বড় অন্তরায়
‘স্বচ্ছ ভারত’ উদ্যোগের পরও ভারত কেন এখনো বিশ্বে সর্বাধিক উন্মুক্ত মলত্যাগের দেশের তকমা বহন করছে—এই প্রশ্ন ঘিরে উঠে এসেছে সামাজিক রীতি, জাতিভেদ, দারিদ্র্য, নিরাপত্তা সংকট ও আচরণগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষণ করল আন্তর্জাতিক মানের রিরাইট।
বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ বা ওপেন ডিফেকেশনের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান এখনও উদ্বেগজনকভাবে শীর্ষে। শৌচাগার নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ ও সরকারি প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও কেন এই অভ্যাস পুরোপুরি কমছে না—এ নিয়েই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সাম্প্রতিক গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটা কেবল শৌচাগারের ঘাটতি নয়; বরং বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক রীতি, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, দারিদ্র্য, নিরাপত্তা সংকট ও জাতিভেদ প্রথা এখনো এই আচরণ বদলের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
■ ‘অভ্যাস’ ও ‘বিশ্বাস’—যা শৌচাগারের চেয়েও শক্তিশালী
ভারতের বহু গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির কাছে বা বাড়ির ভেতরে শৌচাগারকে আজও ‘অশুভ’ বা ‘অপবিত্র’ মনে করা হয়। খোলা মাঠ, ধানক্ষেত, রেললাইন বা নদীর ধারে প্রাতঃকৃত্যকে অনেকেই স্বস্তিদায়ক ও ‘শুদ্ধতার’ প্রতীক হিসেবে দেখেন।
■ জাতিভেদ ও ‘অপবিত্রতা’র ধারণা
গবেষণায় দেখা গেছে, হিন্দু সমাজে প্রচলিত শুদ্ধ–অশুদ্ধ তত্ত্ব উন্মুক্ত মলত্যাগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে দলিতদের হাত দিয়ে শৌচাগারের গর্ত পরিষ্কার করানোর প্রথার কারণে আজও অনেকেই পিট ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে অনীহা বোধ করেন। তাদের মতে, খোলা জায়গায় মলত্যাগ বেশি ‘শুদ্ধ’ ও কম ‘ঝুঁকিপূর্ণ’।
■ দারিদ্র্য, জমির অভাব ও নিরাপত্তাহীনতা
দরিদ্র পরিবারের পক্ষে শৌচাগার বানানো, জমি বরাদ্দ করা বা রক্ষণাবেক্ষণ করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। আবার নারীরা উন্মুক্ত জায়গায় যাওয়া নিয়ে প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন—গ্রামীণ এলাকায় যৌন হয়রানি এমনকি ধর্ষণের ঝুঁকিও থাকে।
শিশুদের মলকে ‘ক্ষতিকর নয়’ বলে ভুল ধারণা থাকার ফলে অনেক পরিবার শিশুর মল ঘরের পাশে বা আঙিনায় ফেলে রাখে, যা পানি ও খাদ্যদূষণের ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
■ জনস্বাস্থ্যের ভয়াবহ প্রভাব
অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে দূষিত পানি, ডায়রিয়া, ডেঙ্গুসহ নানাবিধ সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়ায়। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, স্টান্টিং এবং মৃত্যু হার বেড়ে যায়। ইউনিসেফ জানায়, দূষণ–সম্পর্কিত রোগে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ৮০০ শিশুর মৃত্যু হয়—এর একটি বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ায়।
■ ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’—অগ্রগতি আছে, আচরণগত পরিবর্তন এখনও ধীর
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’ চালুর পর কোটি কোটি শৌচাগার নির্মিত হয়েছে। সরকারি দাবি অনুযায়ী, গ্রামে শৌচাগার কভারেজ অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে।
কিন্তু মাঠের প্রতিবেদনগুলো বলছে, শৌচাগার থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষ পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাচ্ছেন। কারণ, শৌচাগারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য টেকসই আচরণ পরিবর্তনের কাজ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
■ কেন ভারত এখনো এই তকমা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের প্রধান সমস্যাগুলো হলো—
- সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও প্রজন্মগত অভ্যাস
- জাতিভেদ প্রথার ‘শুদ্ধতা–অপবিত্রতা’ ধারণা
- দারিদ্র্য ও জমির অভাব
- জনস্বাস্থ্যে সচেতনতার ঘাটতি
- নারীদের নিরাপত্তাহীনতা
- আচরণ পরিবর্তনে পর্যাপ্ত সামাজিক মোবিলাইজেশনের অভাব
বিশ্লেষকদের মতে, মলত্যাগ–সংক্রান্ত অভ্যাস বদলানো শুধু অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা, শিক্ষার বিস্তার, সামাজিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং শৌচাগারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রভাব সৃষ্টি অপরিহার্য।















