রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে হন্ডুরাসে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ। বিভিন্ন কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ নির্বাচনকে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ভোটে পরিণত করেছে।
নির্বাচনের আগেই উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিবিদেরা অভিযোগ তুলছেন—ভোট জালিয়াতির প্রক্রিয়া নাকি ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট সিয়োমারা কাস্ত্রো পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন “একটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে, যার উদ্দেশ্য নির্বাচনী অভ্যুত্থান ঘটানো”।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্থিরতার সঙ্গে দেশের জনগণ নতুন নয়। মাত্র চার দশকের গণতান্ত্রিক যাত্রায় হন্ডুরাস নানা সময়ে দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয়েছে।
জাতীয় স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কর্মী ড্যানিয়েল ভাল্লাদারেস বলেন, “কূট বা সহিংসতার ভয় সবসময়ই ছিল। এখন যে উত্তেজনা, সেটিও খুব অস্বাভাবিক নয়।”
হন্ডুরাসের প্রধান তিন প্রার্থী
পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে স্পষ্ট কোনো এগিয়ে থাকা প্রার্থী নেই। ফলে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ভোটারদের নজর মূলত তিনজনের দিকে—রিজি মনকাদা (বামঘেঁষা লিব্রে পার্টি), সালভাদর নাসরালা (লিবারেল পার্টি) এবং নাস্রি “টিটো” আসফুরা (জাতীয় পার্টি)।
বিভিন্ন জরিপের ফল একে অপরের বিপরীত। একদিকে একটি জরিপে দেখা যায় মনকাদা পিছিয়ে আছেন, অন্যদিকে আরেকটিতে তিনি অনেক এগিয়ে। আবার কিছু জরিপে তিনজনকেই সমান জনপ্রিয় দেখানো হয়েছে। এই বিভ্রান্তিই বড় দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগ বাড়িয়ে তুলেছে।
আসফুরা অভিযোগ করছেন, ক্ষমতাসীন লিব্রে পার্টি নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে মনকাদা প্রতিবাদ সমাবেশে অভিযোগ করেছেন যে বিরোধীরা “অবৈধভাবে ভোট চুরি করার জন্য জোট বেঁধেছে”।
নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সংকট
অক্টোবরের শেষ দিকে নির্বাচন আয়োজক সংস্থা CNE–কে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। তিন সদস্যের এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত।
LIBRE–এর প্রতিনিধি মারলন ওচোয়া একটি অডিও রেকর্ডিং প্রসিকিউটরদের কাছে জমা দেন, যাতে সহকর্মী কসেট লোপেজ ও এক সামরিক কর্মকর্তার কথোপকথন শোনা যায় বলে দাবি করা হয়। সেখানে ভোট “বদলে দেওয়া” এবং নির্বাচন বয়কটের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল অডিওটিকে সত্য বলে তদন্ত শুরু করলেও ডানপন্থী দলগুলো এটিকে ‘নকল ও বিকৃত’ বলে প্রত্যাখ্যান করছে।
একই সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধানের নির্বাচন ফলাফল নিজেরা গণনা করার দাবি উত্তেজনা আরও বাড়ায়। এটি CNE–এর প্রধান আনাপাওলা হাল ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বিদেশি চাপ ও ট্রাম্পের মন্তব্য
নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও চাপ বাড়ছে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে আসফুরাকে সমর্থন জানান এবং অপর দুই প্রার্থীকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর “কাঠপুতলি” বলে উল্লেখ করেন। তিনি মনকাদাকে ‘নাশকতার সহযোগী’ এবং নাসরালাকে “প্রায় কমিউনিস্ট” বলে দাবি করেন।
এই মন্তব্য হন্ডুরাসের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। হন্ডুরাসের বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের এই প্রচারণা হন্ডুরাসের ডানপন্থীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবেই চলছে।
২০০৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের ছায়া
লিব্রে পার্টির সমর্থকদের কাছে বর্তমান অস্থিরতা ২০০৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে, যখন প্রেসিডেন্ট মেল সেলায়াকে জোর করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট কাস্ত্রোও সেই ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেছেন, দাবি করেছেন একই শক্তিগুলো আবারো জনগণের ইচ্ছাকে দমন করতে সক্রিয়।
অ্যাক্টিভিস্টরা আশঙ্কা করছেন, ২০১৭ সালের নির্বাচনের মতো ফলাফল গোপন বা বিকৃত করার চেষ্টা হতে পারে।
তবে অনেকের মতে, এই দুর্নীতি বা ক্ষমতার লড়াই হন্ডুরাসের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ, যা শুধু একটি নির্বাচনেই দূর হবে না।
আন্তর্জাতিক তদারকি
মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার ৩৩ দেশের সংগঠন ওআইএ দেশটিতে শতাধিক পর্যবেক্ষক পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে হন্ডুরাসে উত্তেজনা বাড়তেই থাকছে, এবং ভোটের দিন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রধান নজর।
















