নাইজেরিয়ার দুইটি স্কুল থেকে শত শত শিশু ও শিক্ষককে অপহরণ করা হয়েছে, যা ২০১৪ সালের চিবোক স্কুলছাত্রী অপহরণের পর সবচেয়ে বড় ঘটনা। দেশজুড়ে সশস্ত্র হামলা বাড়তে থাকায় এ পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
খ্রিস্টান সংগঠন ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব নাইজেরিয়া (CAN) জানিয়েছে, নাইজার অঙ্গরাজ্যের একটি ক্যাথলিক স্কুল থেকে অপহৃত ৫০ জন শিক্ষার্থী পালিয়ে ফিরে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তবে এখনো শতাধিক শিশু ও শিক্ষক বন্দি।
কি ঘটেছিল?
স্থানীয় গণমাধ্যম ও CAN-এর তথ্যমতে, নাইজার অঙ্গরাজ্যের প্রত্যন্ত পাপিরি এলাকায় সেন্ট মেরিজ ক্যাথলিক স্কুলে হামলা চালিয়ে ৩০৩ জন শিশু ও ১২ জন শিক্ষককে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র ব্যক্তিরা। অপহৃতদের মধ্যে ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছেলে–মেয়ে উভয়ই রয়েছে। ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার।
এর আগে পার্শ্ববর্তী কেব্বি অঙ্গরাজ্যের মাগা শহরের একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২৫ শিক্ষার্থীকে অপহরণ করা হয়।
কতজন এখনো নিখোঁজ?
৫০ শিক্ষার্থী পালাতে সক্ষম হলেও এখনো ২৫৩ জন শিশু এবং ১২ শিক্ষক অপহরণকারীদের হেফাজতে রয়েছে। নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী বিশেষ ট্যাকটিক্যাল টিম ও স্থানীয় শিকারিদের নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
কারা এই অপহরণের পেছনে?
কোনো সংগঠন এখনো এ অপহরণের দায় স্বীকার করেনি। স্থানীয় সাংবাদিক ইব্রাহিম এনদামিতসো জানিয়েছেন, উত্তর নাইজার এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাকাত ও সশস্ত্র দস্যুগোষ্ঠীর তৎপরতা ব্যাপক বেড়েছে। এসব গোষ্ঠী সাধারণত গবাদিপশু চুরি, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক বুলামা বুকার্তি বলছেন, স্কুলশিশুদের অপহরণ মূলত অর্থনৈতিক কারণেই করা হয়। অপহরণকারীরা দীর্ঘদিন বন্দি রেখে পরিবারের কাছ থেকে বা সরকারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে থাকে।
ধর্মীয় উদ্দেশ্য কি আছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অপহরণ ধর্মীয় কারণে নয়। এগুলো সংগঠিত হয় স্বাধীন দস্যু গোষ্ঠীর মাধ্যমে, যাদের সঙ্গে বোকো হারাম বা আইএসডব্লিউএপি-এর মতো সংগঠনের সরাসরি যোগ নেই।
২০১৪ সালের চিবোক অপহরণের স্মৃতি আবারও সামনে আসছে। বোকো হারাম সে সময় ২৭৬ ছাত্রীকে অপহরণ করেছিল। অনেককে উদ্ধার করা গেলেও এখনো প্রায় ৯০ জন নিখোঁজ।
খ্রিস্টানরা কি বিশেষভাবে টার্গেট হচ্ছে?
নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলে খ্রিস্টান কৃষক সম্প্রদায় হামলার শিকার হচ্ছে—এ অভিযোগ বহুদিনের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব হামলাকে “খ্রিস্টান গণহত্যা” হিসেবে দাবি করে নাইজেরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। তবে নাইজেরিয়া সরকার বলছে, এগুলো সম্প্রদায়ভিত্তিক কৃষক–গবাদি পশুপালন সংঘাত, ধর্ম নয়।
CAN-ও জানিয়েছে, বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ সংকটকে ধর্মীয় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর নাইজেরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ৪৭টি কলেজ অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। নাইজার অঙ্গরাজ্যও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত।
রবিবার নিরাপত্তা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট বোला টিনুবু ৩০,০০০ নতুন পুলিশ নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ভিআইপি নিরাপত্তা সেবা থেকে পুলিশ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা দুর্বল এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
বোকো হারাম বিদ্রোহ, দস্যু গোষ্ঠীর তৎপরতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নাইজেরিয়া ইতোমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে টিনুবু ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে ১০,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, এবং তিন মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত রয়েছে।
















