বাংলা চলচ্চিত্রের নব্বইয়ের দশক ছিল স্বপ্ন, আলো আর তারকাদের ঝলমলে উপস্থিতিতে ভরপুর। পর্দায় ছিলেন এক ঝাঁক শক্তিমান নায়িকা—যাঁরা অভিনয়ে কাটিয়েছেন দুই থেকে তিন দশক। আজ তাঁরা কেউই আর নিয়মিত নন। কেউ সংসারে, কেউ দূরদেশে, কেউবা শিল্পের প্রাঙ্গণ থেকে একটু দূরে নিভৃত জীবন বেছে নিয়েছেন। সময়ের পথ বেয়ে বদলে গেছে তাঁদের অবস্থান, রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি আর সোনালি দিনের সুবাস।
চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক শাবনাজ, মৌসুমী ও শাবনূরের বর্তমান জীবনযাপন।
শাবনাজ—উত্তরার নিভৃত জীবনে সংসার আর স্মৃতির সঙ্গী
‘চাঁদনী’ ছবির সেই চাঁদনী আজও দর্শকের মনে অম্লান। ১৯৯১ সালের সেই জনপ্রিয় চরিত্রে অভিনয়ের পর শাবনাজ হয়ে উঠেছিলেন ঢালিউডের এক উজ্জ্বল মুখ। তবে গত ১৮ বছর ধরে তিনি নেই চলচ্চিত্রে। এখন তাঁর জীবন ভরপুর স্বামী নাঈম, সন্তান আর শান্ত সংসারের গল্পে।
ঢাকার উত্তরা তাঁর ঠিকানা, আত্মপ্রকাশ সীমিত কিছু ঘরোয়া আয়োজনে। শাবনাজ বলেন, তিনি এখন সম্পূর্ণভাবে সংসারকেন্দ্রিক—স্বামী আর সন্তানই তাঁর পৃথিবী। নাঈমের সঙ্গে তাঁর প্রেম শুরু হয়েছিল ছবির সেটে, আর তিন বছরের মধ্যেই বিয়ে করে ফেলেন তাঁরা। সময়ের ঢেউয়ে ভেসে দুজন কাটিয়েছেন তিন দশকের বেশি সঙ্গ।
নাঈমের কঠিন সময়ে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছিলেন শাবনাজ। সেই দিনগুলোতে স্বামীর জন্য নিজেকে আড়াল করে সংসারের দিকে মনোনিবেশ করেন তিনি। এখনো সেই শান্ত জীবনই তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
মৌসুমী—নিউ জার্সিতে পরিবারকেন্দ্রিক নতুন অধ্যায়
নব্বইয়ের পর্দাজুড়ে এক আলোকরেখা ছিলেন মৌসুমী। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির সুফল তাঁকে তুলে দেয় জনপ্রিয়তার চূড়ায়। কিন্তু দীর্ঘ দেড় বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছেন—এ কথা জানিয়েছেন তাঁর স্বামী ওমর সানি।
ওমর সানি বলেন, মৌসুমী আর অভিনয়ে আগ্রহ খুঁজে পান না। ভালো গল্প না পাওয়া, শুটিংয়ে অসঙ্গতি—এসব তাঁকে ক্লান্ত করে তুলেছে। এখন তিনি মা ও মেয়ে ফাইজাকে নিয়ে থাকছেন, মায়ের অসুস্থতা দেখে, মেয়ের বেড়ে ওঠার পাশে দাঁড়িয়ে।
সবশেষে অভিনয় করেছেন ‘দেশান্তর’ ছবিতে। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে করেছিলেন একটি বিজ্ঞাপনও। তবে তিনি কবে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। হয়তো সময় বদলাবে, হয়তো আবার কোনো গল্পের প্রেমে পড়ে ফিরতে পারেন পর্দায়—এটাই অপেক্ষার।
শাবনূর—অস্ট্রেলিয়ার আকাশে নতুন জীবনের গল্প
চলচ্চিত্রে পা রেখেছিলেন মাত্র ১৪ বছরে। দেড় দশক জুড়ে একের পর এক সফল চরিত্রে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন শাবনূর। আজও তাঁর নাম উচ্চারণে নস্টালজিয়া ছড়িয়ে পড়ে।
এক যুগের বেশি সময় ধরে তিনি অনিয়মিত। এখন সিডনিতে ছেলে আইজানকে নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ভাইবোনদের কাছেই তাঁর পরিবারের কেন্দ্র। মাঝেমধ্যে ঢাকায় এলেও আবার ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ার স্নিগ্ধ জীবনে।
শাবনূর জানান, সেখানে তাঁর সময় কাটে সংসার, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা আর ছেলের পড়াশোনা ও ক্রিকেটপ্রীতির পাশে দাঁড়িয়ে। গাড়ি চালিয়ে ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়া তাঁর কাছে জীবনের আনন্দময় সময়।
ব্যক্তিগত জীবনও এসেছে আলোচনায় বহুবার। প্রেম নিয়ে গুঞ্জন, বিয়ে-বিচ্ছেদ—সবই সামলেছেন ধীরস্থিরভাবে। ২০১১ সালে আংটি বদল করেন ব্যবসায়ী অনীকের সঙ্গে, ২০১২ সালে বিয়ে, ২০১৩ সালে সন্তানের জন্ম। ২০২০ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়, এরপর তিনি একা পথ চলছেন ছেলেকে নিয়ে।
তিন গুণী নায়িকার তিন পথ
সময়ের নদী তিনজনকে নিয়ে গেছে তিন ভিন্ন পথে। তবু তাঁদের নাম, তাঁদের কাজ, তাঁদের জাদুকরী সময় রয়ে গেছে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অলঙ্কার হয়ে।
ফিরে আসবেন কি তাঁরা পর্দায়?
সেটা সময়ই বলবে।
কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে তাঁরা সবসময়ই ফিরবেন—স্মৃতিতে, গানে, পর্দার আলোয় ভেসে আসা সেই সোনালি দিনগুলোর মতো।
















