কোক স্টুডিও বাংলার নতুন গান ‘মাস্ত কালান্দার’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সাড়া ফেলেছে দেশজুড়ে। রুনা লায়লার জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত গানটি তাঁর ভক্তদের জন্য যেন এক বিশেষ উপহার। প্রকাশের তিন দিনের মাথায় গানটির ভিউ পেরিয়েছে ১৫ লাখ। আলোচিত এই গানটির পেছনের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়।
‘মাস্ত কালান্দার’ মূলত একটি সুফিগান, যা ভারতের পাঞ্জাব, পাকিস্তানের সিন্ধ ও ইরানে ব্যাপক জনপ্রিয়। কাওয়ালি ঘরানার এই গানটির মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় পাকিস্তানের সিন্ধ অঞ্চলের সুফি সাধক সৈয়দ উসমান মারভান্দিকে, যাকে ভক্তরা ‘লাল শাহবাজ কালান্দার’ নামে ডাকতেন। তাঁর নামের প্রতিটি অংশে রয়েছে আলাদা আধ্যাত্মিক অর্থ। গেরুয়া পোশাক পরার কারণে তাঁকে বলা হতো ‘লাল’; গভীর আধ্যাত্মিক শক্তি ও উচ্চমনের প্রতীক হিসেবে ‘শাহবাজ’; আর দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত ভ্রমণশীল সাধককে বলা হয় ‘কালান্দার’।
বারো শতকে জন্ম নেওয়া লাল শাহবাজ কালান্দার দীর্ঘ সময় মধ্যপ্রাচ্য ও উপমহাদেশ ভ্রমণ করে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সেহওয়ান শরিফে বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই তিনি মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছড়ান এবং তাঁর দরগাহ আজও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুফি তীর্থস্থান।
‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ গানটির কথায় ভক্তি, প্রেম ও আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট। গানের কয়েকটি লাইন আল্লাহর প্রতি প্রার্থনা, আবার কিছু অংশে আলী (রা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সংযোগও এই গানটির মূল বৈশিষ্ট্য। সিন্ধি হিন্দুরা তাঁকে ‘ঝুলেলাল’ বলে ডাকতেন এবং তাঁকে পানির রক্ষাকারী দেবতার প্রতিরূপ ভাবতেন।
গানটি প্রথম রচিত হয় সুফি কবি আমির খসরুর হাতে। পরে বুল্লে শাহ এটি পরিমার্জন করেন। বহু যুগ পরে চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পীদের মাধ্যমে গানটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। নূরজাহান, আবিদা পারভীন, নুসরাত ফতেহ আলী খান থেকে শুরু করে উপমহাদেশের বিভিন্ন শিল্পী গানটি পরিবেশন করেছেন।
বাংলাদেশে রুনা লায়লা দুই দফা গানটি গেয়েছেন। প্রথমবার তিনি রেকর্ড করেন ১৯৭০ সালে সুরকার নিসার বাজমির সংগীতায়োজনে। সম্প্রতি কোক স্টুডিও বাংলার জন্য সায়ান চৌধুরী অর্ণব ও অদিত রহমানের প্রযোজনায় আবারও গানটি গেয়েছেন তিনি।
একাধিক শিল্পী গানটি করলেও নূরজাহান, আবিদা পারভীন, শাজিয়া খুশক এবং রুনা লায়লার কণ্ঠেই গানটির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। গানটি কেবল সংগীত নয়—এটি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, মানবিক ঐক্য ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক প্রতিবাদের প্রতীক।
‘মাস্ত কালান্দার’ আজও বার্তা দেয়—প্রেম, সংগীত ও নৃত্য বিভেদের দেয়াল ভেঙে মানুষকে একত্রিত করতে পারে।
















