নয়াদিল্লির নীরব রাস্তা আর শীতল বিকেলে হঠাৎই আগুন জ্বলে ওঠে ঢাকার এক ফুটবল মাঠে। অনুশীলনের মাঝখানে শিমা আক্তার জানতে পারে সেই খবর—ফেরারি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের রায়। মুহূর্তেই তার মনে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের মুখ, যারা নৃশংস দমনপীড়নের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছিল। শিমার কাছে এটি শুধু একটি আদালতের রায় নয়, বরং রক্তে লেখা এক প্রতিশোধের প্রতিধ্বনি।
কিন্তু শিমার প্রত্যাশা, ঢাকার রাজপথে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো হাসিনা—এত সহজ নয় বাস্তবের মাটিতে। কারণ তিনি এখন ভারতের রাজধানীতে নির্বাসনে, যেখানে তাকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার বারবার অনুরোধ জানালেও নীরব থেকে যাচ্ছে নয়াদিল্লি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ভারতের প্রতি অভিযোগের সুর তুলেছে। তাদের যুক্তি, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যার্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারতের বাধ্যবাধকতা। সেই দাবির বিপরীতে ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তবে প্রত্যার্পণ না করার স্বাধীনতা থাকে ভারতের। আর নয়াদিল্লি বর্তমান মামলাটিকে দেখছে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে।
সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী স্পষ্ট করে বলেন, “ভারত কিভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে?” ভারতের কাছে হাসিনা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, দীর্ঘ দশকের সম্পর্কের একজন আস্থাভাজন রাজনৈতিক মিত্র।
বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার, যারা ভারতের প্রতি প্রকাশ্য অসন্তোষ দেখিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পথ বেছে নিয়েছে। সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনে হাসিনাকে ফেরত দেওয়া মানে নয়াদিল্লির নিজের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করে ফেলা—এমনটাই মনে করেন ভারতের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের দৃষ্টিতে, ঢাকা আজ এমন শক্তির হাতে, যারা নয়াদিল্লিকে বন্ধুহীন করার পথে এগোচ্ছে। তাই তাদের কাছে হাসিনা শুধু একজন নির্বাসিত নেত্রী নয়, বরং অতীতের স্থিতিশীল আঞ্চলিক সম্পর্কের প্রতীক। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সঞ্জয় ভারদ্বাজ বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন শক্তিদের হাতে যারা প্রকাশ্যেই ভারতবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ভারতের জন্য হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
তবুও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে চিরতরে জমাট বাঁধতে দিতে চায় না ভারত। তারা জানায়, বাংলাদেশের মানুষের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিকাশে ভারত সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন আলোর রেখা আনতে পারে বলে আশা আন্তর্জাতিক মহলের।
হাসিনার ব্যক্তিগত ইতিহাসও ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৭৫ সালে তার পরিবারের প্রায় সবাই নিহত হওয়ার পর তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন দিল্লির বুকে। সেখানেই কাটে তার বহু বছর। সেই পুরনো সম্পর্কের দায়ভারও বয়ে বেড়াচ্ছে ভারত।
এদিকে বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশ হাসিনার প্রতি তীব্র ক্ষোভ পুষে রেখেছে। তাদের কাছে তিনি একদা শক্তিমান শাসক, যার পতনে ভেসে ওঠে অগণিত শহীদের স্মৃতি। তাই মৃত্যুদণ্ডের রায়ে তাদের উল্লাস সীমাহীন। কিন্তু বাস্তবের রাজনীতিতে রায় বাস্তবায়ন এখনো বহু দূরের পথ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, হাসিনার আশ্রয় ভারতকে একদিকে বিচলিত করলেও অন্যদিকে তার পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও নশ্বর নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলে, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বংশগুলি কখনোই সম্পূর্ণ বিলীন হয় না।
ফলে ভারত অপেক্ষায় আছে—সময় বদলাবে, রাজনীতি নতুন রূপ নেবে, আর সেখানেই হয়তো আবারও ফিরে আসতে পারে হাসিনার রাজনৈতিক ছায়া।
এই জটিল কূটনৈতিক স্রোতের মধ্যে এক দেশের রক্তক্ষরণ, আরেক দেশের নীরবতা—কোথাও যেন মিলেমিশে আছে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস। দুদেশের প্রাচীন বন্ধন আজ টানাপোড়েনের দোলাচলে। তবুও সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায় না, বরং সময়ের আগুনে আরও পরীক্ষিত হয়।
অথচ ঢাকার রাস্তায় আজো শোনা যায় শিমার মতো তরুণদের সূর্যের মতো তপ্ত কণ্ঠ—“আমরা তাকে আমাদের চোখের সামনে বিচার হতে দেখতে চাই।” কিন্তু রাজনীতির কাগুজে মানচিত্রে সেই দাবি কতটা বাস্তবে পৌঁছাবে, তার উত্তর এখনো অনেক দূরে, বহু অন্ধকার গলির গভীরে লুকিয়ে আছে।
















