স্বপ্ন ছিল আলোর, বাস্তবতা ফিরেছে ছায়ায়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার পতনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, নিখোঁজ আর হত্যার অন্ধ অধ্যায় শেষ হবে। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পর, দেশের রাস্তায় এখনো প্রতিধ্বনিত হয় সেই পুরনো ভয়ের পদধ্বনি।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ন্যায়বিচার, সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে—অবৈধ হত্যা, নির্যাতন ও নিখোঁজের চক্র এখনও থামেনি, বরং ফিরে এসেছে ভিন্ন মুখে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে নিহত হয়েছেন। কেউ গুলিতে, কেউ হেফাজতে, কেউ মারধরে প্রাণ হারিয়েছেন—সবই পূর্বতন সময়ের মতো ভয়াবহ রূপে।
২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার আমলে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন প্রায় ২৫৯৭ জন। আন্দোলনের দাবানল জ্বলে ওঠে মূলত সেই রক্তের প্রতিবাদেই। অথচ এখনো মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও প্রবণতা থামেনি।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “যা আশা করিনি, তা-ই হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে ধীরে আবার বাড়ছে।” তিনি মনে করিয়ে দেন, ইউনুস সরকার ক্ষমতায় এসে নিখোঁজের বিচার ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পুরনো ধরন অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত একই গল্প। যুবদল নেতা আসিফ শিকদারকে মিরপুরে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মৃত ঘোষণা করা হয় হাসপাতালে। কুমিল্লার ইটাল্লা গ্রামে যুবনেতা তৌহিদুল ইসলামকে আটক করে “সাধারণ পোশাকে” একদল বাহিনী। পরে তার নিথর দেহে নির্যাতনের চিহ্ন মিলেছিল। তিনি এসেছিলেন পিতার জানাজায়, রেখে গেছেন স্ত্রী আর চার মেয়ে।
প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী তদন্তের আশ্বাস দেয় এবং সাতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। তবে এসব পদক্ষেপ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
অধিকারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউনুস সরকারের প্রথম ১৪ মাসে গড়ে প্রতি মাসে তিনজন মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে নিহত হয়েছেন। শেষ ত্রৈমাসিকেই মারা গেছেন ১১ জন। কেউ “ক্রসফায়ার”-এ, কেউ নির্যাতনে, কেউ হেফাজতে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, “পুরনো ব্যবস্থার উত্তরাধিকার এখনো বেঁচে আছে।” অধিকারের কর্মকর্তা তাসকিন ফাহমিনা জানান, “সংখ্যা কমেছে, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায়নি। আগে এটি ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত, এখন হয়তো ছড়ানো-ছিটানোভাবে ঘটছে, তবুও ভয়ের বাস্তবতা একই।”
তিনি আরও বলেন, “২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনায় আমরা দেখেছি নিরাপত্তা বাহিনী শেখ হাসিনার দলীয় সমর্থকদের সঙ্গেও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যাতে পাঁচজন নিহত হন। অর্থাৎ প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা রয়ে গেছে।”
সেনাবাহিনীর দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় মোতায়েন থাকা তাদের শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বকেও নষ্ট করছে বলে মন্তব্য করেন ফাহমিনা। তিনি বলেন, “সেনারা নাগরিক আইনপ্রয়োগে প্রশিক্ষিত নন। দীর্ঘ মাঠে থাকা তাদের মনোভাব বদলে দিয়েছে।”
তবে সম্প্রতি সরকার জানিয়েছে, সেনা সদস্যদের অর্ধেককে মাঠ থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৫ বছরের শেখ হাসিনা শাসনে নিরাপত্তা বাহিনীর দায়মুক্তি যেন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। তখন হাজারো মানুষ গুম বা হত্যা হন, অনেকের খোঁজ আর পাওয়া যায়নি। ইউনুসের নেতৃত্বে সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের অবসান হবে—এই বিশ্বাসেই উল্লসিত হয়েছিল দেশ ও বিদেশ। কিন্তু এখন সেই আশা সন্দেহে পরিণত হচ্ছে।
নিখোঁজ তদন্ত কমিশনের তথ্য বলছে, হাসিনার সময়ে ১৭৫২ জন মানুষ গুম হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকেই নিহত, ৩৩০ জনের এখনো কোনো সন্ধান নেই। র্যাব, পুলিশ ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকারকে র্যাব ও টেলিকম নজরদারি সংস্থা এনটিএমসি বিলুপ্ত করার পরামর্শ দেয়, তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অক্টোবরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও ২৫ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ১৫ জনকে ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে, বাকিদের অবস্থান অজানা।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এটি ন্যায়বিচারের পথে এক প্রতীকী অগ্রগতি মনে করলেও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়া এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
নূর খান লিটন বলেন, “২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকে জনগণ আর আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে বিশ্বাস ভেঙে গেছে। দেশ কোন পথে এগোচ্ছে, কেউ জানে না।”
অন্যদিকে বিএনপির নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনই হবে প্রকৃত পরীক্ষা। “নির্বাচিত সরকারই জবাবদিহিতা ফেরাতে পারবে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন গণআস্থাহীন, তাই সংস্থাগুলো নিজস্ব নির্দেশে চলে।”
ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন কিছু বলে। ২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারই র্যাব গঠন করেছিল—আর তখনই শুরু হয়েছিল “ক্রসফায়ার”-এর অজুহাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা।
তাসকিন ফাহমিনা বলেন, “আসল পরীক্ষা হবে নির্বাচনের পর—তখনই বোঝা যাবে বাংলাদেশ কি সত্যিই নতুন পথে হাঁটবে, নাকি পুরনো ভুলগুলোকেই আবার পুনরাবৃত্তি করবে।”
















