গাজার পোড়া মাটি, ধ্বংসস্তূপে ভরা শহর, আর বাতাসে ছড়ানো মৃত্যুর গন্ধ—এমন এক বিভীষিকার গল্প উঠে এসেছে নতুন এক প্রামাণ্যচিত্রে। যুক্তরাজ্যের আইটিভি নেটওয়ার্কে সম্প্রচারিত ‘ব্রেকিং র্যাংকস: ইনসাইড ইসরায়েলস ওয়ার’ নামের চলচ্চিত্রে দেখা যায়, গাজায় মোতায়েন ইসরায়েলি সেনাদের মুখে তাদের নিজের যুদ্ধের সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি, আর লজ্জার ইতিহাস।
এক সেনা বলেন, “ভয়ানক গরম, ধুলা, দুর্গন্ধ, আর কুকুরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে—মৃতদেহ খেয়ে। যেন এক মৃত শহর, এক জম্বি দুনিয়া। গাছ নেই, পথ নেই, শুধু মৃত্যু।”
চলচ্চিত্রটিতে অংশ নেওয়া অনেক সৈন্য স্বীকার করেছেন, তারা এমন এক যুদ্ধের অংশ ছিলেন যা মানবতাকে ছিন্নভিন্ন করেছে। কেউ কেউ বলেন, তারা বুঝে গিয়েছিলেন—এ যেন এক প্রণীত গণহত্যা। কেউ মুখ ঢেকে বলেন, “এক মুহূর্তের জন্য যদি ভাবতে শুরু করো, নিজেকে শেষ করতে ইচ্ছে করবে। ভাবা যায় না এমন এক অন্ধকার।”
দুই বছরের এই বিধ্বংসী যুদ্ধের ফলে গাজায় নিহত হয়েছে প্রায় ৬৯ হাজার মানুষ, আহত হয়েছে লক্ষাধিক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, হয়তো কয়েক দশক লাগবে, গাজা যদি কখনও ফিরে দাঁড়াতে পারে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রও বলছে, নিহতদের প্রায় ৮৩ শতাংশই ছিল সাধারণ মানুষ।
এক ট্যাংক কমান্ডার, ড্যানিয়েল বলেন, “গাজায় কোনো বেসামরিক মানুষ নেই—এ কথাটা আমরা সবসময় শুনি।” তার সহকর্মী, মেজর নেটা ক্যাসপিন জানান, ব্রিগেডের রাব্বি একদিন তাকে বলেছিলেন, “আমাদেরও হতে হবে সেদিনের মতো—৭ অক্টোবরের মতো নির্মম, প্রতিশোধ নিতে হবে সবার ওপর, এমনকি শিশু ও নারীও বাদ নয়।”
অন্য এক কর্মকর্তা, ইয়োতাম ভিল্ক বলেন, “গাজায় ‘হুমকি’ বলতে কিছু নেই, সন্দেহই যথেষ্ট মৃত্যুর জন্য। কেউ ভুল জায়গায় হাঁটলে তাকেই টার্গেট করা হয়।”
প্রামাণ্যচিত্রে উঠে আসে ‘মশা প্রোটোকল’-এর ভয়ঙ্কর বাস্তবতা—প্যালেস্টাইনি বেসামরিক নাগরিকদের ধরে, তাদের শরীরে ফোন বেঁধে সন্দেহজনক এলাকা পরীক্ষা করতে পাঠানো হতো। এক সেনা বলেন, “প্রতিটি কোম্পানির নিজেদের ‘মশা’ থাকে। শত শত মানুষকে ব্যবহার করা হয়েছে মানব ঢাল হিসেবে।”
একই সঙ্গে চলচ্চিত্রে দেখা যায় ধ্বংসের উল্লাস। সৈন্যরা ভিডিও করেছে, হাসতে হাসতে গাজাবাসীর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে, বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে শহর। অবৈধ ইসরায়েলি বসতি বেইত এল থেকে এক রাব্বি গর্বের সঙ্গে বলেন, “আমি নিজের হাতে ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছি। রাফাহ, জাবালিয়া, খান ইউনুস—সব সমতল হয়ে গেছে। আমরা পুরো এক সেনাবাহিনীর মানসিকতা বদলে দিয়েছি।”
চলচ্চিত্রের আরেক অংশে এক সৈন্য বলেন, “এখানে প্রতিদিন মনে হয় আজই শেষ দিন। তাই যা খুশি করতে পারো। কারণ, কেউ থামায় না।”
যুদ্ধের এই বর্ণনায় প্রতিধ্বনিত হয় অপরাধবোধ আর লজ্জার সুর। এক সেনা বলেন, “সব মসজিদ, প্রায় সব হাসপাতাল, সব বিশ্ববিদ্যালয়—সবই ধ্বংস। একটা সমাজ মুছে গেছে। তাদের একে একে না মেরে পুরো অস্তিত্বটাই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।”
শেষে আরেক সৈন্য কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলেন, “আমি জানি না কিভাবে বাঁচব—প্রতিটি পদক্ষেপে এই লজ্জা নিয়ে।”
















