আকাশে উড়ন্ত স্বপ্নের রূপ যেন ধীরে ধীরে বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। শতবর্ষ পুরনো ধারণা, যেখানে বিমানের ডানার সঙ্গে শরীর একীভূত—একই বক্ররেখায় গড়া পুরো কাঠামো—সেই “ব্লেন্ডেড উইং” নকশাই হয়তো আগামী দশকে বিশ্বের আকাশে নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে।
২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পেন্ডলটন এয়ার রেঞ্জ থেকে প্রথম উড্ডয়ন করেছিল একটি ছোট্ট, ভি-আকৃতির রিমোট কন্ট্রোল বিমান। নাম তার ‘স্টিভ’। মাত্র ১৬ সেকেন্ডের উড়ান হলেও এই ক্ষণিকের যাত্রাই খুলে দিয়েছে ভবিষ্যতের এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা। এর নির্মাতা সিয়াটল-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আউটবাউন্ড অ্যারোস্পেস স্বপ্ন দেখছে ২০৩০-এর দশকে ২০০ থেকে ২৫০ আসনের এক নতুন প্রজন্মের বিমান ‘অলিম্পিক’ উন্মোচনের।
এই বিমানের ডানার বিস্তার হবে ৫২ মিটার—স্টিভের প্রায় আট গুণ। এবং এর নকশা এতটাই অদ্ভুত, যেন ডানার সঙ্গে বিমানের শরীর একাকার, কোনো স্পষ্ট বিভাজন নেই। শত বছর আগেই এই ধারণার জন্ম হলেও, এতদিন তা সীমাবদ্ধ ছিল সামরিক ব্যবহারে—যেমন বিখ্যাত ব্ল্যাকবার্ড বা বি-২১ রেইডারের মতো যানে। কিন্তু এখন যখন পৃথিবী কার্বন নিঃসরণ কমাতে লড়ছে, তখনই হয়তো এই ডিজাইন বাণিজ্যিক উড্ডয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
আউটবাউন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন বোয়িং প্রকৌশলী জেক আর্মেন্টা বলেন, “আমরা একদম শূন্য থেকে মাত্র এক বছরে এই উড়োজাহাজের নকশা থেকে উড্ডয়ন পর্যন্ত পৌঁছেছি।” তাঁর দাবি, এই পদ্ধতিতে তারা বিমানের উন্নয়ন সময় ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কমাতে পারবেন।
এখন ‘স্টিভ’ কেবল গবেষণার অংশ নয়, তা পরিণত হচ্ছে এক কার্যকর কার্গো ড্রোনে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ও বেসরকারি ক্রেতাদের আগ্রহ জাগিয়েছে।
তবে আউটবাউন্ড একা নয় এই যাত্রায়। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক নবীন প্রতিষ্ঠান জেটজিরো ইতিমধ্যেই পেয়েছে ২৩৫ মিলিয়ন ডলার তহবিল যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী থেকে, পাশাপাশি বিনিয়োগ করেছে ইউনাইটেড ও আলাস্কা এয়ারলাইনস। তাদের ‘জেড-৪’ বিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ২০২৭ সালের মধ্যেই করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষক বিল সুইটম্যান বলেন, “ব্লেন্ডেড উইং নিয়ে আগ্রহ এখন একপ্রকার উন্মাদনা। ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা পুরনো শিল্পে বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করছে, আর আকাশপথ এখন তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।”
বৈজ্ঞানিকভাবে এই নকশা অত্যন্ত জটিল। কারণ ব্লেন্ডেড উইং বিমানে বাতাসের প্রবাহ, ভারসাম্য ও চাপের বন্টন সাধারণ টিউব-উইং নকশার চেয়ে অনেক কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাছাড়া যাত্রীবাহী বিমানে চাপযুক্ত কেবিনের প্রয়োজনীয়তা এই নকশাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
তবুও আশাবাদী আউটবাউন্ড। তারা উন্নত থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব অল্প বাজেটে কার্বন ফাইবারে তৈরি করছে এই নতুন প্রজন্মের বিমান। তাদের দাবি, এটি আগের যেকোনও পরীক্ষামূলক প্রকল্পের তুলনায় দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং উদ্ভাবনী।
আর্মেন্টা বলেন, “আমরা বোয়িং বা এয়ারবাসের ছায়ায় হাঁটতে চাই না, বরং নতুন করে কল্পনা করতে চাই আকাশের ভবিষ্যৎকে।”
ব্লেন্ডেড উইং বিমান শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, এটি এক দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লব। যদি সফল হয়, তবে এটি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি কম ব্যবহার করবে, কমাবে শব্দ ও দূষণ, এবং যাত্রীদের জন্য এনে দেবে আরও প্রশস্ত, আধুনিক কেবিন।
বিশ্বের প্রথম ব্লেন্ডেড উইং বিমান ‘ওয়েস্টল্যান্ড ড্রেডনট’ ১৯২৪ সালে উড়েছিল এবং একই দিনে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এক শতাব্দী পর, হয়তো আউটবাউন্ড ও জেটজিরোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সেই পুরনো স্বপ্নকে নতুন করে বাস্তবায়িত করবে—একটি এমন পৃথিবী গড়তে যেখানে আকাশও হবে নীরব, পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যে ভরা।
















