কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তুমুল সংঘর্ষ চলছে।
গত কয়েকদিন ধরে ওপার থেকে ভেসে আসা মর্টারশেল ও শক্তিশালী বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে সীমান্তবর্তী জনপদ। এতে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি বাহিনী। আরাকান আর্মিও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। বুধবার রাত সোয়া নয়টার দিকে মংডু শহরতলিতে আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে হঠাৎ বিমান হামলা শুরু হয়। টেকনাফ সীমান্তের লোকজন নাফ নদীর ওপারে রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলার দৃশ্য দেখতে ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন।
সীমান্তঘেঁষা সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, রাত সোয়া নয়টার পর থেকেই মংডু টাউনশিপ এলাকায় ধারাবাহিকভাবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। থেমে থেমে চালানো হচ্ছে বিমান হামলা। রাত ১১টা পর্যন্ত এপার থেকে ওই দৃশ্য দেখা গেছে। এতে নাফ নদীসংলগ্ন শাহপরীর দ্বীপ, জালিয়াপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তীব্র কম্পন অনুভূত হচ্ছে। সীমান্ত জনপদের মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নাফ নদীতে কোস্টগার্ড ও সীমান্তে বিজিবির টহল রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া, জালিয়াপাড়া, সাবরাং, শাহপরীরদ্বীপ, নাজিরপাড়া, হ্নীলা, জাদিমুড়া, দমদমিয়া ও হোয়াইকংসহ সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নোমান সৈয়দ জানান, বুধবার রাতে পরপর কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জিয়াউর রহমান বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে আসা বিকট শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক সময় এটি ভূমিকম্পের মতো অনুভূত হচ্ছে।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জানান, নাফ নদীর ওপার থেকে থেমে থেমে ভেসে আসা বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা নতুন করে আতঙ্কে রয়েছেন। পরিস্থিতির ওপর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজর রাখছে।
টেকনাফের জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, সীমান্তের ওইপাড় থেকে সকাল থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দ ভেসে এসেছে। রাত ৮ টার পর থেকে আগুনের শিকা ও বেশ কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা গেছে। এতে স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ বেড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় সাত মাস পর আবারও মিয়ানমারের দিক থেকে গোলাবর্ষণের শব্দ শুনলাম। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে চারবার বিকট বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। পরে বুঝতে পারি, সীমান্তের ওপার থেকেই বিস্ফোরণের শব্দ আসছে।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুক মান্নান জানান, “বহুদিন পর মিয়ানমারে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে মানুষের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। অনেকে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম অনীক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘর্ষের কারণে বিস্ফোরণের শব্দ বাংলাদেশ সীমান্তেও শোনা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের গোলা বা মর্টারশেল এসে পড়ার ঘটনা ঘটেনি। সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মর্টারশেল ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আরাকান আর্মির দখলে থাকা রাখাইন রাজ্যে আবার হামলা শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার।
















