ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য বিহারে শুরু হয়েছে ভোট উৎসব। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন প্রায় ৭ কোটি ৪০ লাখ ভোটার। এই নির্বাচন শুধু বিহারের জন্য নয়, পুরো ভারতের রাজনৈতিক তাপমাত্রা মাপার এক গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে উঠেছে—১৭ মাস আগে কম আসনে জিতে ক্ষমতায় ফেরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তারও পরীক্ষা এটি।
বিহার ভারতের দরিদ্রতম রাজ্য, কিন্তু ১৩ কোটি মানুষের এই ভূমি দেশের রাজনীতিতে এক বিশাল প্রভাব রাখে। মোট ২৪৩টি আসনের মধ্যে প্রথম দফায় ভোট হচ্ছে ১২১টি আসনে। এই পর্বে নির্ধারিত হবে অনেক প্রভাবশালী নেতা ও নবীন মুখের ভাগ্য।
স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। ২০২০ সালের নির্বাচনে মোট ভোট turnout ছিল ৫৭ শতাংশের কাছাকাছি।
বিহারের ভোটার সংখ্যা যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ভোটারদের সামনে এবার দুই প্রধান জোট—একদিকে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ও নীতীশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড), অন্যদিকে লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট।
নীতীশ কুমার প্রায় দুই দশক ধরে রাজ্যটি শাসন করছেন। অপরদিকে আরজেডির তরুণ নেতা তেজস্বী যাদব—একসময় দেশের রেলমন্ত্রী থাকা লালু যাদবের পুত্র—এবার রাঘোপুর আসন থেকে লড়ছেন। তার বিপক্ষে রয়েছেন বিজেপির সতীশ কুমার ও জন সুরাজ পার্টির চঞ্চল সিং।
এই নির্বাচনে আরেক নতুন মুখ হিসেবে আসছে রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরাজ। তিনি একসময় মোদি ও কংগ্রেস—উভয়ের সঙ্গেই কাজ করেছেন, এবার নিজেই ময়দানে।
বিহারের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, কিন্তু দারিদ্র্য ও বেকারত্বে জর্জরিত। দুই জোটই চাকরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের অঙ্গীকার করছে। নারী ভোটারের অংশগ্রহণ রাজ্যে দিন দিন বেড়ে চলছে, অনেক সময় পুরুষদেরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কংগ্রেস জোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নারীদের মাসিক ভাতা, অন্যদিকে বিজেপি সরকার ইতিমধ্যে নারীদের জন্য ৮৮০ মিলিয়ন ডলার বিতরণ করেছে ছোট ব্যবসা শুরুর সহায়তা হিসেবে।
এই নির্বাচন নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক শক্তিরও এক বড় পরীক্ষা। ২০২৪ সালে তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরলেও বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, এখন তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর।
বিহারের ৪০টি লোকসভা আসনের মধ্যে গত নির্বাচনে বিজেপি ও জেডিইউ পেয়েছিল ২৪টি। তবে আরজেডি রাজ্যে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে তারা এককভাবে সর্বাধিক ভোট পেয়েছিল।
এবারের নির্বাচন আরেক কারণে ঐতিহাসিক—এটি হয়তো নীতীশ কুমার (৭৪) ও লালু যাদবের (৭৭) শেষ মুখোমুখি রাজনৈতিক যুদ্ধ। চার দশক ধরে যারা বিহারের রাজনীতিকে গড়ে তুলেছেন, আবার কখনো ভেঙেছেনও।
তবে নির্বাচনের ছায়া নেমেছে বিতর্কেও। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে, ভারতের নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করেছে যাতে বিজেপির লাভ হয়। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, প্রায় ৪৭ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, বিশেষ করে সীমাঞ্চল অঞ্চলে—যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
এ অঞ্চলের বহু দরিদ্র মানুষের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নেই—শিক্ষা সনদ, জন্মনিবন্ধন কিংবা ঠিকানার কাগজ। এতে অনেকে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় ভীত।
এই প্রেক্ষাপটে মোদির সরকার সীমাঞ্চলকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ঘাঁটি’ বলে প্রচারণা চালিয়েছে—যদিও তথ্য বলছে, সেই দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
বিহারের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই ভারতের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা—দুটিই এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে।
















