বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, নিরাপদ পানির সংকট এবং যানজট—সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকা এখন ‘অচল মেগাসিটি’। নদীদূষণ ও দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নাগরিক সেবায় নগরবাসীর জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে নয়, বরং নেতৃত্বের সক্ষমতা, জবাবদিহি এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই ঢাকাকে বাঁচানো সম্ভব।
‘ঢাকা কি মৃত নগরী হতে যাচ্ছে? সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক এক নগর সংলাপের মূল প্রবন্ধে এ কথাগুলো তুলে ধরা হয়। আজ শনিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ওই সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ও নগর অধিকার কর্মী ওমর সাদাত।
ওমর সাদাত বলেন, ঢাকাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে এখনই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পেশাদারির সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এই মেগাসিটি অদূর ভবিষ্যতে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে।
ঢাকা এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, বুড়িগঙ্গাসহ চারপাশের নদীগুলো দখল ও দূষণে কার্যত এখন মৃত। তাই নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণে দূরের মেঘনা নদীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি।
সমস্যা থেকে উত্তরণের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কঠোর আইন প্রয়োগ, সমন্বিত নগর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। পরিকল্পিত সবুজায়ন, বর্জ্যের আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার মতো উদ্যোগও জরুরি।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মিরপুরের প্যারিস খাল গত দুই মাসে সাতবার পরিষ্কার করা হয়েছে। এরপরও খালটি আবার নোংরা হয়ে গেছে। খালপাড়ে যারা বর্জ্য ফেলে, তাদের জরিমানার আওতায় আনার আলোচনা চলছে।
প্রশাসক বলেন, ফুটপাতে একসময় যেখানে ২০০ হকার ছিল, এখন তা বেড়ে দুই হাজার হয়েছে। ২ শতাংশ মানুষের কারণে ৯৮ শতাংশ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। কিছু হকারের জন্য পুরো ঢাকাবাসীর ভোগান্তি কাম্য নয়।
নির্দিষ্ট জায়গায় অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণভাবে হকারদের বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে জানিয়ে প্রশাসক বলেন, হকারদের পুনর্বাসনে প্রাথমিকভাবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ছয়টি খোলা জায়গায় অস্থায়ী মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেখানে নিবন্ধনের মাধ্যমে তাঁদের ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি আদায়ের মাধ্যমে ওই জায়গার রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। দোকানগুলো ট্রলির মতো ভ্রাম্যমাণ হবে, যাতে নির্দিষ্ট সময় পর সরিয়ে নেওয়া যায়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, নগর সেবাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা গেলে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং সেবার মান বাড়বে। তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। যানজট নিরসনে পার্কিং স্পেস উদ্ধারে কাজ চলছে এবং যাঁরা পার্কিংয়ের নির্ধারিত জায়গা অবকাঠামো করে রেখেছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ বলেন, নগরীর বিভিন্ন স্থানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণাধীন থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কোনো প্রকল্প ৫ বছরে শেষ করার কথা থাকলেও লাগছে ১২ বছর। কোনো কাজ সময়মতো করা যাচ্ছে না।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, ঢাকার গণপরিবহনের জন্য ২০ বছরের একটি পরিকল্পনার কাজ চলছে। বিভিন্ন বাসমালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকার ৪২টি রুট থেকে কমিয়ে ৩২টিতে আনার চেষ্টা হচ্ছে। একটি রুটে এক কোম্পানিরই বাস চলবে। এভাবে বাস চলাচল হলে ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে। এ বছরের মধ্যেই এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস রুটে নামানো হবে।
নগর সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহ। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমন। উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুজাউল ইসলাম খান, কীটতত্ত্ববিদ ইন্দ্রাণী ধর ও পরিবেশবিদ আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম প্রমুখ।
















