যুদ্ধের মানসিক আঘাতে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে এক প্রজন্ম
গাজায় ১১ লাখের বেশি শিশু মানসিক সহায়তার জরুরি প্রয়োজন
গাজার চলমান সংঘাতের ভয়াবহ প্রভাব এখন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে শিশুদের মধ্যে। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাজার হাজার শিশু যুদ্ধের আঘাত, ভয় এবং ট্রমার কারণে হঠাৎ করে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ১১ লাখ শিশু এখন মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় ভুগছে। এই সংকট শুধু শারীরিক নয়—গভীরভাবে মানসিক।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের কথা হারানোর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। একদিকে রয়েছে বিস্ফোরণ, মাথায় আঘাত বা স্নায়বিক ক্ষতি; অন্যদিকে রয়েছে ভয়াবহ মানসিক ট্রমা, যা কোনো দৃশ্যমান ক্ষত ছাড়াই শিশুকে নীরব করে দেয়।
গাজার একটি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক শিশু হঠাৎ করেই কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছে। কেউ কেউ সম্পূর্ণভাবে বাকশক্তি হারাচ্ছে—যাকে “সিলেক্টিভ মিউটিজম” বা “হিস্টেরিকাল অ্যাফোনিয়া” বলা হয়। এটি মূলত চরম মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া।
একজন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কাত্রিন গ্লাটজ ব্রুবাক বলেন, “এটা এক ধরনের নীরব কষ্ট। শিশুরা এত বেশি ভয় ও সহিংসতার মধ্যে থাকে যে তাদের শরীর নিজেই প্রতিক্রিয়া হিসেবে বন্ধ হয়ে যায়।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, অনেক শিশু “ফ্রিজ রেসপন্স”-এ চলে যায়—যেখানে তারা না লড়তে পারে, না পালাতে পারে। ফলে শরীর ও মস্তিষ্ক এক ধরনের স্থবির অবস্থায় চলে যায়, এবং কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়।
গাজায় এই সমস্যা আরও ভয়াবহ কারণ এখানে নিরাপত্তার কোনো অনুভূতি নেই। চারদিকে হামলা, মৃত্যু, ধ্বংস—শিশুরা কখনোই নিশ্চিত হতে পারে না যে তারা নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা শিশুদের ভবিষ্যৎ বিকাশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তারা খেলাধুলা, শেখা ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মস্তিষ্ক দীর্ঘ সময় “বেঁচে থাকার মোড”-এ থেকে যায়, যা শেখা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
চিকিৎসা সম্ভব হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত থেরাপি, নিরাপদ পরিবেশ এবং ধৈর্যই শিশুদের ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু গাজার বাস্তবতায় এই সুবিধাগুলো প্রায় অনুপস্থিত।
তবুও ছোট ছোট প্রচেষ্টা—যেমন খেলাধুলা, শ্বাস নিয়ন্ত্রণ, কিংবা সাধারণ থেরাপি—শিশুদের ধীরে ধীরে ভয় থেকে বের করে আনতে সাহায্য করতে পারে।
সব মিলিয়ে, গাজার এই সংকট শুধু বর্তমান নয়—একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই ‘নীরব যন্ত্রণা’ হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর।
















