ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ও সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করার প্রস্তাব নতুন করে সামনে আনলেও সদস্য দেশগুলোর মতভেদের কারণে তা আটকে গেছে। স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিলেও জার্মানি ও ইতালি এর বিরোধিতা করেছে।
লুক্সেমবার্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে ইউরোপের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন পরীক্ষার মুখে। তবে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল এই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের কথা বলেন।
গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ইউরোপে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনা বাড়ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও উঠেছে।
২০০০ সালে কার্যকর হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি দুই পক্ষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ভিত্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল ইউরোপের বাজারে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। ২০২৪ সালে দুই পক্ষের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো।
চুক্তির দ্বিতীয় ধারা অনুযায়ী মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতিমালা মানা বাধ্যতামূলক। এই ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইউরোপের নাগরিক সমাজ ইতোমধ্যে চুক্তি স্থগিতের দাবিতে ব্যাপকভাবে সরব হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি স্থগিত হলে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইউরোপ ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। একই সঙ্গে ইসরায়েলের গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতও ইউরোপীয় সহায়তার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
তবে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বড় বাধা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। পূর্ণ স্থগিতাদেশ দিতে হলে ২৭টি সদস্য দেশের সর্বসম্মতি প্রয়োজন, যা বর্তমানে সম্ভব নয়। আংশিক স্থগিতের ক্ষেত্রেও বড় দেশগুলোর সমর্থন জরুরি, যেখানে জার্মানির মতো দেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের ইতিহাসের কারণে জার্মানির ইসরায়েলের প্রতি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ডের মতো দেশ ফিলিস্তিন ইস্যুকে নিজেদের উপনিবেশবিরোধী অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে।
এছাড়া ইউরোপের কিছু ডানপন্থী সরকার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করছে, যা নিষেধাজ্ঞার পথে আরেকটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। কিছু দেশ এককভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতালি ইতোমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিত করেছে। সুইডেন ও ফ্রান্স বসতি অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না এলেও নিচু স্তর থেকে চাপ বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করতে শুরু করেছে।
গাজায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ইউরোপের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে মানবাধিকার নীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কঠিন সমন্বয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।
















