এই নভেম্বর যেন সিনেমার এক মহোৎসব। রুপালি পর্দায় ফুটে উঠছে ভালোবাসা, ভয়, ইতিহাস, মৃত্যু আর পুনর্জন্মের গল্প। নিকোলাস বার্বারের তালিকায় রয়েছে বারোটি সিনেমা, যেগুলোর প্রতিটিতে মিশে আছে সময়ের গন্ধ আর অনুভূতির আগুন।
প্রথমেই আসছে ‘দ্য রানিং ম্যান’। স্টিফেন কিংয়ের ছদ্মনাম রিচার্ড বাচম্যানের লেখা এক ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসের রূপান্তর। এবার এটি পরিচালনা করেছেন ‘শ্যন অফ দ্য ডেড’-খ্যাত এডগার রাইট। এক সাধারণ মানুষ, যার অর্থকষ্ট তাকে ঠেলে দেয় মৃত্যুঝুঁকির টেলিভিশন শো-তে। বেঁচে থাকলে পাবে অর্থ, কিন্তু প্রতিদিন তার পিছু নেয় ঘাতকের দল। বাস্তবতার সঙ্গে আজকের পৃথিবীর অস্বস্তিকর সাদৃশ্য টেনে রাইট বলেন, এটি যেমন বিনোদন, তেমনি এক সতর্কবার্তাও।
দ্বিতীয় সিনেমা ‘নুরেমবার্গ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নাৎসি বিচারকক্ষের পটভূমিতে তৈরি এই ছবিতে রামি মালেক আর রাসেল ক্রোর অভিনয় নাকি টানবে শ্বাস বন্ধ করে রাখার মতো টানটান উত্তেজনা। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আর এক অনুতাপহীন অপরাধীর বুদ্ধির লড়াই—যেন ইতিহাসের বুক থেকে উঠে আসা ভয়ংকর বাস্তবতা।
‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ নরওয়েজিয়ান পরিচালক জোয়াকিম ট্রিয়ারের এক আবেগঘন পুনর্মিলন। ‘দ্য ওয়ার্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর দল এবারও একত্র। এক বাবার ব্যর্থ গৌরব, এক কন্যার প্রতিরোধ—এ যেন সিনেমার ভাষায় সম্পর্কের জটিল নৃত্য।
‘ডাই, মাই লাভ’—জেনিফার লরেন্স ও রবার্ট প্যাটিনসনের প্রেম, একসঙ্গে এক অন্ধকার যাত্রা। প্রথমে ভালোবাসা, তারপর মানসিক অস্থিরতা, মাতৃত্ব আর একাকিত্বের গহ্বর। পরিচালক লিন র্যামসের স্পর্শে ছবিটি হয়ে উঠেছে আবেগের দহনক্ষেত্র।
‘জে কেলি’তে জর্জ ক্লুনি এক সুদর্শন তারকা, যার জীবনের পরিপূর্ণতার মুখোশের নিচে লুকিয়ে আছে আত্মসংশয়ের ঘূর্ণি। নোয়া বাউমবাখের পরিচালনায় এটি এক বিষণ্ণ রোমান্টিক ভ্রমণ, যেখানে আড়ম্বরের আড়ালে মানবিক ভাঙন উঁকি দেয়।
‘লেফট-হ্যান্ডেড গার্ল’ তৈরি হয়েছে আইফোনে—সিনেমাটিক প্রযুক্তির নতুন ভাষায়। তাইওয়ানের ব্যস্ত নগরে এক মা ও দুই মেয়ের সম্পর্কের ওঠানামা এখানে ধরা পড়েছে নির্মোহ, কোমল বাস্তবতায়।
সবচেয়ে আলোচিত ‘উইকেড: ফর গুড’—ব্রডওয়ে মিউজিক্যালের দ্বিতীয় অধ্যায়। সিনথিয়া এরিভো ও আরিয়ানা গ্র্যান্ডে দুই জাদুকরীর গল্পে এবার নতুন গান, নতুন জাদু। “আমি ভালো হতে চাই, সত্যিকার অর্থে,” গ্লিন্ডার কণ্ঠে যেন প্রতিধ্বনিত হয় মানুষের পরিবর্তনের আকুলতা।
‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ আমাদের নিয়ে যায় ব্রাজিলের সামরিক শাসনের অন্ধকারে। কার্নিভালের উন্মাদনার ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয়ের গল্প এটি। ওয়াগনার মৌরার অভিনয় আর ক্লেবার মেন্ডনসা ফিলহোর নির্মাণে রাজনীতি, বিশৃঙ্খলা আর মানবিক বেঁচে থাকার এক কাব্যিক প্রতিফলন।
‘জুটোপিয়া ২’—প্রাণীদের পৃথিবীতে ফিরে আসছে জুডি হপস আর নিক ওয়াইল্ড। এবার প্রশ্ন, সেখানে সরীসৃপরা কোথায়? ইতিহাসে ফিরবে দর্শক, রসবোধ আর বুদ্ধিমত্তার মিশেলে আবারও এক সামাজিক রূপক তৈরি করবে ডিজনি।
‘ইটারনিটি’ প্রেম, মৃত্যু আর অনন্তের মিলন। মৃত্যুর পর স্বর্গে এক নারীর সামনে প্রশ্ন—সে কাকে বেছে নেবে? স্বামী নাকি পুরনো প্রেমিক? এলিজাবেথ অলসেন, মাইলস টেলার আর ক্যালাম টার্নারের অভিনয়ে ছবিটি এক উষ্ণ, উদ্ভট, হৃদয়ছোঁয়া যাত্রা।
‘ওয়েক আপ ডেড ম্যান: এ নাইভস আউট মিস্ট্রি’তে ড্যানিয়েল ক্রেগ আবার ফিরে এসেছেন গোয়েন্দা বেনোয়া ব্ল্যাঙ্ক হয়ে। এবার ঘটনাস্থল নিউইয়র্কের এক গির্জা, হত্যাকাণ্ড ঘিরে ঘন রহস্য। আগের দুই পর্বের চেয়ে অন্ধকার, কিন্তু আরও রসিক ও সূক্ষ্ম এই পর্বটি।
শেষে ‘হ্যামনেট’। শেক্সপিয়রের পুত্রের মৃত্যু আর তারপরে লেখা ‘হ্যামলেট’-এর মধ্যে দুঃখের সেই সংযোগের গল্প। ক্লোয়ি ঝাওয়ের পরিচালনায় জেস বাকলি আর পল মেস্কালের অভিনয়ে ছবিটি যেন শোকের ভেতর ভালোবাসার জন্ম। এক পিতা, এক কবি, এক শোকের মহাকাব্য।
এই নভেম্বর তাই শুধু সময়ের নয়, অনুভূতিরও উৎসব। সিনেমার পর্দায় ঝরে পড়ছে ভালোবাসা, মৃত্যু, ইতিহাস আর স্বপ্নের বৃষ্টি—যেখানে প্রতিটি গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের মঞ্চে আলো-অন্ধকার একসঙ্গেই বাজায় তাদের নীরব সিম্ফনি।
















