মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় মিচোয়াকান রাজ্য আজ শোকে আচ্ছন্ন। উরুয়াপান শহরের রাস্তায় কালো পোশাকে হাজারো মানুষ, হাতে ফুল আর গলায় একটাই স্লোগান—“ন্যায় চাই! ন্যায় চাই!”—যেন প্রতিটি কণ্ঠে একই আর্তি, নিহত মেয়র কার্লোস মানজোর জন্য ন্যায়বিচার।
শনিবার রাতে উরুয়াপানের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলে চলছিল “ডে অব দ্য ডেড” উৎসব। আনন্দে ভরা সেই মুহূর্তে, গুলির শব্দে থমকে যায় শহর। মাত্র ৪০ বছর বয়সী মেয়র মানজোকে সাতটি গুলি করে হত্যা করা হয়। সঙ্গে থাকা এক কাউন্সিল সদস্য ও দেহরক্ষী গুরুতর আহত হন।
স্থানীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ওমর গার্সিয়া হারফুচ জানিয়েছেন, হামলাকারী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি এলাকার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী গোষ্ঠীর সংঘর্ষে আগেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
“এ হত্যাকাণ্ড কাপুরুষোচিত, বর্বর,” বলেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম। তিনি জরুরি বৈঠক ডেকে ঘোষণা দিয়েছেন—“ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, অপরাধীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না।”
কার্লোস মানজো ছিলেন সংগঠিত অপরাধের কড়া সমালোচক, যিনি প্রকাশ্যে অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে উরুয়াপানের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করার পর থেকেই তিনি মৃত্যুভয়ের কথা বলেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে মানজো বলেছিলেন, “আমি চাই না আমার নাম সেই তালিকায় উঠুক—যেখানে লেখা থাকে, আরেকজন মেয়র নিহত।”
অ্যাভোকাডো রাজধানী হিসেবে পরিচিত উরুয়াপান মিচোয়াকানের হৃদয়ে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল চাহিদার কারণে অ্যাভোকাডো শিল্প এখন অপরাধচক্রের লোভের লক্ষ্যবস্তু। মানজো এই শিল্পকে সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি সরকারি সুরক্ষায় ছিলেন, পরে মে মাসে সেই নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়। তবু উৎসবের ভিড়—একটি দুর্বল মুহূর্ত—হত্যাকারীরা সেই সুযোগেই আঘাত হানে। “তারা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করেছে,” বলেন হারফুচ। “আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি—এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।”
উরুয়াপানের মানুষের শোক এখন প্রতিরোধে পরিণত হয়েছে। ফুলে ঢাকা কফিনের পাশে মানুষ কাঁদছে, আলিঙ্গন করছে, তবু তাদের চোখে জ্বলছে প্রতিজ্ঞার আগুন—এই শহর আর ভয় পাবে না।
মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ছবির সঙ্গে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর সঙ্গে মিলে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে সংগঠিত অপরাধ নির্মূলে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”
এ হত্যাকাণ্ড যেন এক অশুভ ধারারই অংশ। এর আগে চলতি বছরের জুনে একই রাজ্যের তাকাম্বারো শহরের মেয়র সালভাদর বাস্তিদাস ও তার দেহরক্ষীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছর অক্টোবরেও উরুয়াপানে সাংবাদিক মরিসিও ক্রুজ সোলিসকে হত্যা করা হয়—ঠিক মানজোর সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরপরই।
এখন পুরো মেক্সিকো প্রশ্ন করছে—আর কতজন? আর কতজন নেতা, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষকে জীবন দিতে হবে এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে? উরুয়াপানের আকাশে আজও বাজছে শোকসঙ্গীতের সুর, আর তার সঙ্গে মিশে আছে একটি জাতির আর্তনাদ—ন্যায় চাই, ন্যায় চাই।
















