কাম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী ও স্মাচ শহরের একটি বিশাল ভবনে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের এক গোপন আস্তানা, যেখানে ভুয়া পুলিশ স্টেশন, ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নকল পরিবেশ তৈরি করে বিশ্বজুড়ে মানুষকে প্রতারণা করা হতো।
ছয়তলা এই ভবনের প্রতিটি কক্ষ ছিল আলাদা আলাদা প্রতারণার কেন্দ্র। কোথাও অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ স্টেশনের আদলে সাজানো ঘর, কোথাও ভিয়েতনামের ব্যাংকের অনুকরণ, আবার কোথাও ব্রাজিলের পুলিশের নামে জাল নথি তৈরি করা হতো। দেয়ালে লেখা থাকত উৎসাহমূলক বার্তা, আর চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত নকল ডলার।
এই কম্পাউন্ডে বিভিন্ন দেশের হাজারো মানুষকে কাজ করানো হতো কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে। অনেককে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এখানে আনা হলেও পরে তাদের দিয়ে জোর করে অনলাইন প্রতারণা করানো হতো। দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হতো এবং নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না করলে মারধরসহ নানা শাস্তি দেওয়া হতো।
প্রতারণার কৌশল ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। কর্মীদের নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কণ্ঠ ও চেহারা পরিবর্তন করে নিজেকে অন্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এরপর বিশ্বাস অর্জন করে বিনিয়োগ বা আর্থিক সহায়তার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো।
একজন ভুক্তভোগী কর্মী জানান, তাদের শৌচাগারে যাওয়ার সময় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং প্রতিটি কার্যক্রম নথিভুক্ত করা হতো। এমনকি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করলে বেত্রাঘাত ও নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
এই প্রতারণা কেন্দ্রটি থাইল্যান্ডের বিমান হামলার পর খালি হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপ পড়ে রয়েছে। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, এটি কেবল একটি উদাহরণ, এমন আরও বহু কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কাম্বোডিয়া সরকার সম্প্রতি এসব প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে হাজারো বিদেশি কর্মীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযান সত্ত্বেও প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। কারণ এই চক্রগুলো সহজেই নতুন জায়গায় স্থানান্তর হয়ে আবার কার্যক্রম শুরু করতে পারে।
এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক প্রতারণা কতটা বিস্তৃত ও সংগঠিত হয়ে উঠেছে এবং এটি দমনে বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
















