রোববার ২ নভেম্বর, ২০২৫
বাংলাদেশের গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও জ্বালানি আমদানির জন্য উচ্চ ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা।
এলএনজি আমদানির বিশাল লক্ষ্যমাত্রা
- মোট আমদানির পরিকল্পনা: চলতি অর্থবছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করেছে পেট্রোবাংলা।
- স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বৃদ্ধি: মোট আমদানির প্রায় ২৯ শতাংশ কার্গো (মোট ৩৩টি কার্গো) স্পট মার্কেট থেকে কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্পট বনাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দামের ফারাক
দেশে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ৫৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে না গিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল প্রমাণিত হচ্ছে।
| চুক্তির ধরন | কার্গোর সংখ্যা (২০২৫-২৬ প্রাক্কলন) | প্রতি এমএমবিটিইউ দাম (প্রাক্কলন) |
| দীর্ঘমেয়াদি (বিদ্যমান ও নতুন) | ৭১টি | $৯ থেকে $১১ |
| স্পট মার্কেট | ৩৩টি | $১৪ |

উল্লেখ্য: দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দাম কম হলেও, স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজির দাম অনেক বেশি (প্রাক্কলিত $১৪/এমএমবিটিইউ)। তবে, সম্প্রতি স্পট মার্কেট থেকে কেনা সর্বশেষ কার্গোটির দাম ছিল $১১.৮৮/এমএমবিটিইউ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: সুযোগ হাতছাড়া ও অর্থ সাশ্রয়ের অভাব
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিগত সরকার এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্য ও দীর্ঘমেয়াদি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে গুরুত্ব না দেওয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে আরও বেশি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
- বিগত সরকারের দুর্বলতা: তিন বছর আগে কাতার ও ওমান থেকে কম মূল্যের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রস্তাব এলেও তৎকালীন সরকার বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কম থাকায় তা উপেক্ষা করেছিল। এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে বর্তমানে বিপুল অর্থ সাশ্রয় করা যেত।
- খরচ সাশ্রয়ের সুযোগ: যদি স্পট মার্কেট থেকে কেনা ৩৩টি কার্গোর বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আনা যেত, তাহলে পেট্রোবাংলার বিপুল পরিমাণ ব্যয় সাশ্রয় হতো।
তবে জ্বালানি বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম যুক্তি দিয়েছেন যে, ১০-২০ শতাংশ এলএনজি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কেনার সুযোগ রাখা উচিত, কারণ খারাপ আবহাওয়ায় আমদানি জটিলতা বা টার্মিনালে ত্রুটিজনিত সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানে স্পট মার্কেট কার্যকর।
ভূমিভিত্তিক (ল্যান্ডবেজড) টার্মিনালের অভাব
পেট্রোবাংলার ব্যয় বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভূমিভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের অভাব। বিগত সরকার ভাসমান টার্মিনালে (Floating Storage and Regasification Unit – FSRU) বেশি মনোযোগী হওয়ায় ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।
- অতিরিক্ত রিগ্যাসিফিকেশন ব্যয়: ভাসমান টার্মিনাল ব্যবহারের কারণে রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ২০১৮-১৯ থেকে শুরু করে এই আট বছরে দুটি ভাসমান টার্মিনালের পেছনে গড়ে বার্ষিক ২ হাজার কোটি টাকা হিসাবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
- সাশ্রয়ের সুযোগ: বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এলএনজি আমদানির শুরুতেই ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে এই রিগ্যাসিফিকেশন ব্যয়ের ৭০ শতাংশ অর্থ দিয়েই টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভব ছিল।
দ্রুত পদক্ষেপ: বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে পিপিপি (Public Private Partnership) মডেলে ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় সাত থেকে আট বছর সময় লাগবে।
স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার মূল কারণ হলো গত দুই দশকে স্থানীয় গ্যাসের অনুসন্ধানে বড় আকারের বিনিয়োগ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়নি।
- বিনিয়োগের বৈষম্য: বাজেটে বিগত দেড় দশকে বিদ্যুত খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল তার তুলনায় যৎসামান্য।
- বর্তমান পরিস্থিতি: বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ২,৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম মনে করেন, আমদানিনির্ভরতা সমাধান নয়, বরং এতে দীর্ঘমেয়াদি বিপদ বাড়বে। তিনি স্থানীয় উত্তোলন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়ার এবং অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে বিস্তৃত অনুসন্ধান ও ড্রিলিং করার ওপর জোর দিয়েছেন।
















