রিয়াদে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের গোপন বৈঠক; প্রতিরক্ষা শিল্প ও আঞ্চলিক স্থিতিশীল রক্ষায় ‘নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের পরিকল্পনা
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত শক্তিকে একত্রিত করতে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে মুসলিম বিশ্বের চার প্রভাবশালী দেশ—তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তান। গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রিয়াদে ইসলামি দেশগুলোর সম্মেলনের ফাঁকে এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, তুরস্ক গত এক বছর ধরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, যেখানে এখন মিশরকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই সম্ভাব্য জোটটি ন্যাটোর মতো কোনো সামরিক বাধ্যবাধকতা না হলেও এটি একটি শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করবে, যা প্রতিরক্ষা শিল্প এবং বৃহত্তর সামরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার (২১ মার্চ) এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী দেশ হিসেবে আমরা কীভাবে আমাদের শক্তিকে একত্রিত করে সমস্যার সমাধান করতে পারি, তা খতিয়ে দেখছি।” তিনি ‘আঞ্চলিক মালিকানা’র ওপর গুরুত্বারোপ করে সতর্ক করেন যে, মুসলিম দেশগুলো যদি নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে না শেখে, তবে বহিরাগত আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থ এই অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেবে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরানের সাম্প্রতিক হামলা এবং ইসরায়েলের ‘সম্প্রসারণবাদী’ নীতির ফলে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় এই চার দেশের যৌথ সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আঙ্কারা মনে করে, ন্যাটোর আদলে কোনো গ্যারান্টি না থাকলেও এই দেশগুলোর সক্ষমতা একত্রিত করলে তা একটি বিশাল প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।
প্রস্তাবিত এই জোটে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশেরই রয়েছে বিশেষ সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা। তুরস্ক যেখানে উন্নত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেখানে পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক শক্তি এবং সৌদি আরব হয়ে উঠেছে উন্নত প্রযুক্তির প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে, জনবহুল আরব রাষ্ট্র হিসেবে মিশরের বিশাল সামরিক বাহিনী এই জোটের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক ও মিশরের মধ্যে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই সহযোগিতার পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে। রিয়াদের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার সমালোচনা করার পাশাপাশি একে অপরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং অভিন্ন প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী ভারসাম্য নিয়ে আসবে।
















