হরমুজ প্রণালীর মধ্যে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপ একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত, অন্যদিকে বর্তমানে এটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। একসময় পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হলেও এখন এই দ্বীপের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর কেশম দ্বীপের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এটি এখন একটি কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রায় ১,৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি পারস্য উপসাগরের অন্যতম বড় দ্বীপ। এর অবস্থান এমন যে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
দ্বীপটির প্রায় দেড় লাখ বাসিন্দা মূলত সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপন করে। তারা প্রতিবছর একটি উৎসবের মাধ্যমে সমুদ্রকে সম্মান জানায়, যেখানে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই দ্বীপটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পানিশোধন কেন্দ্রে বিমান হামলা চালানো হয়, যার ফলে আশপাশের বহু গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর জবাবে ইরান বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
ক্ষেপণাস্ত্র নগরী
কেশম দ্বীপ এখন ইরানের একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত একটি অদৃশ্য বিমানবাহী রণতরীর মতো কাজ করছে।
দ্বীপটির ভূগর্ভে বিস্তৃত জটিল নেটওয়ার্কে লুকিয়ে রাখা হয়েছে দ্রুতগতির নৌযান, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম। এসব স্থাপনাকে একত্রে বলা হয় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী।
এই ঘাঁটিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করে দেওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে এবং শুধুমাত্র সীমিত সংখ্যক জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।
এ কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ নিজেদের জাহাজ চলাচলের জন্য আলাদা সমঝোতার চেষ্টা করছে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
কেশম দ্বীপের ইতিহাস বহু প্রাচীন। বিভিন্ন সময়ে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল এবং বহু সাম্রাজ্যের অধীনে এসেছে।
প্রাচীন যুগে এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগে এটি পারস্য উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
১৬শ শতকে অটোমান নৌবাহিনী এই দ্বীপ আক্রমণ করে বিপুল সম্পদ দখল করে। পরে পর্তুগিজরা এখানে দুর্গ নির্মাণ করে, কিন্তু পরবর্তীতে পারস্য ও ইংরেজ বাহিনী তাদের উৎখাত করে।
১৯শ শতকে ব্রিটিশরা এখানে নৌঘাঁটি স্থাপন করে, যা দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হয়।
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য
সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি কেশম দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও বিখ্যাত। এখানে ম্যানগ্রোভ বন, শিলাস্তম্ভ, গুহা ও বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক গঠন রয়েছে।
এই দ্বীপে রয়েছে বিশেষ একটি ভূতাত্ত্বিক পার্ক, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
এখানকার তারকা উপত্যকা নামে পরিচিত এলাকায় রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে গঠিত পাথরের স্তম্ভ ও গিরিখাত। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এটি কোনো এক সময় আকাশ থেকে পতিত তারার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
নামাকদান লবণ গুহা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ গুহাগুলোর একটি, যার দৈর্ঘ্য কয়েক কিলোমিটার। এর ভেতরে রয়েছে প্রাচীন লবণের স্তর।
চাহকুহ গিরিখাতও এই দ্বীপের আরেকটি আকর্ষণ, যেখানে সরু ও গভীর পাথুরে পথ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।
সব মিলিয়ে কেশম দ্বীপ এখন একদিকে সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্র, অন্যদিকে প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ। বর্তমান সংঘাতের কারণে এই দ্বীপের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে।
















