গাজার আকাশে আবারও আগুন ও ধোঁয়ার লেলিহান দৃশ্য। মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস-নিয়ন্ত্রিত সিভিল ডিফেন্স বিভাগ ও স্থানীয় হাসপাতালগুলো।
ইসরায়েল দাবি করেছে, এই হামলা ছিল হামাসের “যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের” প্রতিক্রিয়া। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, দক্ষিণ গাজায় এক হামলায় একজন ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হন এবং হামাস মৃত জিম্মিদের দেহ ফেরত দেওয়ার চুক্তিও ভঙ্গ করেছে। হামাস অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তারা যুদ্ধবিরতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “কিছুই যুদ্ধবিরতিকে বিপন্ন করতে পারবে না।” তবে তিনি যোগ করেন, “যদি ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলা হয়, তাহলে ইসরায়েল প্রতিশোধ নেবে—এটাই স্বাভাবিক।”
মঙ্গলবার রাতের এই হামলায় গাজার বিভিন্ন শহরে ঘরবাড়ি, স্কুল ও আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাজা সিটির সাবরা এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার স্তম্ভ উঠতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের শব্দ কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো এলাকা।
সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র জানান, কেবল গাজা সিটিতেই নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন, এর মধ্যে তিন নারী ও এক পুরুষকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে আবু শারার পরিবারে পাঁচ সদস্য নিহত হন, আর দক্ষিণের খান ইউনিসে একটি গাড়িতে বিমান হামলায় মারা যান আরও পাঁচজন।
তিনি আরও জানান, উদ্ধারকর্মীরা “অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে” কাজ করছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেক মানুষ আটকা থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তিনি গাজায় “শক্তিশালী পাল্টা আঘাতের” নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইওভ গালান্ট বলেন, হামাস “লাল রেখা অতিক্রম করেছে” এবং এর জন্য “বহুগুণ মূল্য দিতে হবে।”
মঙ্গলবার দক্ষিণ রাফাহ শহরে এক ইসরায়েলি প্রকৌশলী সৈন্য নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ভূগর্ভস্থ টানেল থেকে বেরিয়ে আসা বন্দুকধারীদের হামলার মুখে পড়ে।
হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, “আমাদের যোদ্ধারা রাফাহে কোনো আক্রমণ চালায়নি। আমরা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি অটল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এই বর্বর হামলা যুদ্ধবিরতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন।”
একই সঙ্গে সংগঠনটি জানায়, ইসরায়েলি হামলার কারণে মঙ্গলবার উদ্ধার করা এক জিম্মির মৃতদেহ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বিষয়টি নিয়ে বড় কোনো আশঙ্কা দেখছে না। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “যতদূর বুঝি, হামাস একজন ইসরায়েলি সৈন্যকে হত্যা করেছে, তাই ইসরায়েল প্রতিশোধ নিয়েছে—এটাই স্বাভাবিক।”
তিনি বলেন, “হামাস শান্তির পথে এক ক্ষুদ্র অংশ, কিন্তু তাদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।”
এদিকে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হামাসকে ৪৮ জন জিম্মি—জীবিত ও মৃত—৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফেরত দিতে বলা হয়েছিল। ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ১৩ অক্টোবর মুক্তি পায় ২০ জীবিত ইসরায়েলি জিম্মি, বিনিময়ে ইসরায়েল ছেড়ে দেয় ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে।
এখন পর্যন্ত ১৩ মৃত ইসরায়েলি জিম্মির দেহ ফেরত দিয়েছে হামাস, পাশাপাশি দুই বিদেশি—একজন থাই ও একজন নেপালি নাগরিকের মৃতদেহও হস্তান্তর করেছে। তবে আরও ১১ জন ইসরায়েলি, একজন তানজানিয়ান ও একজন থাই নাগরিকের দেহ এখনো গাজায় রয়েছে।
মঙ্গলবার নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, হামাস সম্প্রতি যে কফিনটি ফেরত দিয়েছে তাতে থাকা মানবদেহ অন্য এক জিম্মির—যার মরদেহ ২০২৩ সালে উদ্ধার হয়েছিল। তিনি এটিকে “চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, হামাস যোদ্ধারা আগে থেকেই প্রস্তুত করা স্থানে দেহাবশেষ কবর দেয় এবং পরে রেড ক্রসকে ডেকে “ভুয়া পুনরুদ্ধার” প্রদর্শন করে।
রেড ক্রস পরে জানায়, তারা “ভালো বিশ্বাসে” ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিল, কিন্তু “পূর্বপরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ছিল না।” সংস্থাটি বলে, “এমন ভুয়া পুনরুদ্ধার মানবিক বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করে—যখন শত শত পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষায়।”
মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি ছিল ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। কিন্তু মঙ্গলবার রাতের বোমাবর্ষণ সেই শান্তি পরিকল্পনার ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস-নেতৃত্বাধীন আক্রমণের পর থেকে ইসরায়েলের পাল্টা অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৬৮ হাজার ৫৩০ জনেরও বেশি মানুষ, হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী।
গাজার নিঃশব্দ রাতগুলো আবারও রক্তে রাঙা—যুদ্ধবিরতির ছায়া এখন জ্বলছে বোমার আগুনে।
















