তিন দশকের প্রতীক্ষার পর, অবশেষে জাপান এমন এক পথে পা রাখতে চলেছে যা তাকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে “স্বাভাবিক দেশ” হিসেবে ভাবতে সাহায্য করবে—যেমনটা করে পৃথিবীর অন্যান্য স্বাধীন জাতি। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও তার জোটসঙ্গী নিপ্পন ইশিন নো কাই সম্প্রতি তাদের যৌথ নীতিপত্রে প্রতিরক্ষা রপ্তানির বাকি বাধাগুলো সরানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
এর তাৎপর্য শুধু নীতিগত নয়, মানসিকও। এটি এমন এক মানসিকতা ভাঙার প্রচেষ্টা, যা দশকের পর দশক ধরে জাপানের প্রতিরক্ষা ভাবনায় আত্মনিয়ন্ত্রণের এক মোটা দেয়াল তুলে রেখেছিল।
একজন জাপানি কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে বলেছিলেন—“খুব শিগগিরই রপ্তানি নীতিতে শিথিলতা আসবে।” প্রায় ত্রিশ বছর পর, সেই প্রতিশ্রুত সময় যেন সত্যি হতে চলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে জাপানের প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিন বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া থেকেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল। কিন্তু এখন যদি নীতিগত বাঁধা পুরোপুরি উঠে যায়, তাহলে অতীতের মতো আইনি কৌশল ও ভাষার জটিলতা আর লাগবে না।
এতে শিল্পখাতের মনোভাবও বদলে যেতে পারে। এতদিন জাপানি কোম্পানিগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে লাভজনক খাত হিসেবে দেখেনি, কারণ রপ্তানির সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। এখন এই সীমাবদ্ধতা না থাকলে, বিদেশে বাজার তৈরির আকর্ষণ তাদের কাছে বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠবে।
প্রতিরক্ষা রপ্তানির এই মুক্তি জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। ইতিমধ্যেই ফিলিপাইনকে অবসরপ্রাপ্ত কোস্টগার্ড জাহাজ দিয়েছে টোকিও। এবার নৌযুদ্ধজাহাজ বিক্রির আলোচনা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার জন্য নতুন ডেস্ট্রয়ার তৈরির চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে—কিছু জাহাজ জাপানে, কিছু অস্ট্রেলিয়ায় নির্মিত হবে। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এমনকি নিউজিল্যান্ডও সম্ভাব্য ক্রেতাদের তালিকায় আছে।
এক অর্থে জাপান আবার হয়ে উঠতে পারে “গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার”—অর্থাৎ এমন এক দেশ, যা মিত্রদের জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম তৈরি করবে, হয়তো লাভের বিনিময়ে, কিন্তু পারস্পরিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে। এরই এক ঝলক দেখা গেছে যখন জাপান নিজস্ব তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের পর তাদের ভান্ডার পূরণে সাহায্য করার জন্য। ভবিষ্যতে সরাসরি ইউক্রেনকেও সরঞ্জাম দিতে পারে জাপান—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই পথচলায় একটি বড় ভূমিকা রেখেছে কোমেইতো দলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টির (এলডিপি) পুরনো সম্পর্কের অবসান। কোমেইতো বহু বছর ধরে জাপানের আত্মরক্ষাবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর হুমকির জবাবদিহির প্রচেষ্টাকে আটকে রেখেছিল। অনেক বিশ্লেষক এমনও বলেন—কোমেইতো চীনের প্রভাবের বাইরে ছিল না।
এখন এলডিপি ও ইশিন নো কাই-এর নতুন জোট জাপানকে সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করছে। তারা এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছে, যা প্রতিরক্ষাকে দায় নয়, বরং জাতীয় আত্মসম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখে।
নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি দায়িত্ব নিয়েছেন ২২ অক্টোবর। তার হাতে এখন এই রূপান্তরকে কার্যকর করার দায়িত্ব।
দীর্ঘদিন জাপানিরা নিজেদের বলেছে—“এটা সম্ভব নয়”, “এটা খুব কঠিন।” কিন্তু সময় বদলেছে। আজ তাদের সামনে এক নতুন সুযোগ দাঁড়িয়ে—নিজেদের সুরক্ষার পাশাপাশি অন্যদের নিরাপত্তাতেও অবদান রাখার।
জাপান হয়তো রাতারাতি অস্ত্রশক্তিধর রপ্তানিকারক হয়ে উঠবে না। কিন্তু যে দরজা একসময় বন্ধ ছিল, তা অবশেষে খুলেছে। আর ইতিহাস বলে—জাপান ধীরে চলে, কিন্তু থামে না।















