টানা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেও ক্ষমতায় দৃঢ় অবস্থান, জাতীয়তাবাদ ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের রাজনীতি
অতীতের উগ্র রাজনীতি থেকে বর্তমানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসন—ভুচিচের দীর্ঘ যাত্রা
সার্বিয়ায় টানা দ্বিতীয় বছরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চললেও প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ এখনো দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় আছেন। ছাত্র আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন।
ভুচিচের রাজনৈতিক জীবনের শুরু নব্বইয়ের দশকে, যখন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। তরুণ বয়সে তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী সার্বিয়ান র্যাডিক্যাল পার্টিতে যোগ দেন এবং “বৃহত্তর সার্বিয়া”র পক্ষে অবস্থান নেন। বসনিয়ার যুদ্ধের সময় তিনি বিতর্কিত বক্তব্য দেন এবং পরে তথ্য মন্ত্রী হিসেবে কঠোর গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। সেই সময় সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের ওপর নজিরবিহীন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পরে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে থাকলে তিনি দল পরিবর্তন করে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি গঠন করেন, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে অবস্থান নেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক কৌশল—উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে তুলনামূলক মধ্যপন্থায় সরে এসে বৃহত্তর ভোটভিত্তি তৈরি করা। তিনি স্রেব্রেনিৎসায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেও ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি।
ক্ষমতায় এসে ভুচিচ একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিয়েছেন, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন। চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। একই সময়ে ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দিলেও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
দেশের ভেতরে তাঁর শাসন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছেন এবং অধিকাংশ গণমাধ্যমকে প্রভাবাধীন করেছেন। বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে কুৎসা, স্বাধীন সাংবাদিকদের হুমকি ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, সমালোচনা প্রায়ই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূচনা হয় নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায়। দুর্নীতিপূর্ণ নির্মাণ প্রক্রিয়ার অভিযোগ তুলে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি পদত্যাগ করলেও বিক্ষোভ থামেনি। আন্দোলনকারীরা আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভুচিচ জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংক ধরে রাখতে কঠোর অবস্থান নেন, বিশেষ করে কসোভো ইস্যুতে। তিনি কসোভোর স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেননি এবং বিষয়টিকে রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষা বদলান—পশ্চিমা মহলে সংস্কারক, আর দেশীয় রাজনীতিতে শক্ত নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন।
সমালোচকদের মতে, ভুচিচ নিজেকে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন এবং বিশ্বাস করেন, দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য তাঁর নেতৃত্ব অপরিহার্য। সমর্থকেরা বলেন, তাঁর আমলে বেকারত্ব কমেছে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই অগ্রগতির আড়ালে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয় ঘটছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় ফুটবল মাঠের উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল ভারসাম্য—সবকিছুর মধ্য দিয়ে ভুচিচ আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তবে চলমান বিক্ষোভ প্রমাণ করছে, তাঁর ক্ষমতার ভিত এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে এবং সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
















