ঢাকার মধ্যরাতে হাতে মশাল নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন একদল নারী। তাদের স্লোগান ছিল স্পষ্ট—“মানুষ রক্ত দিয়েছে, এবার চাই সমতা।” ১৭ বছর পর ঘোষিত অবাধ নির্বাচনের আগে এমন দৃশ্য যেমন আশার প্রতীক, তেমনি অনেক নারীর মনে বাড়ছে উদ্বেগও।
২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ, বহু বিরোধী নেতা মুক্ত হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে শক্ত অবস্থান নিয়েছে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী, যা শাসনামলে কঠোরভাবে দমন-পীড়নের শিকার ছিল।
ইসলামপন্থীদের শক্ত অবস্থান
জামায়াতে ইসলামী এবার ১১ দলীয় জোট গড়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে বড় ভোট পেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সংসদে একটি শক্তিশালী ইসলামপন্থী দল কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকবে—হোক তা সরকারে বা প্রধান বিরোধী দলে।
সমালোচকদের দাবি, গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের খেলাধুলা বন্ধের চাপ, পোশাক নিয়ে কটূক্তি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ার মতো ঘটনাগুলো ইতোমধ্যে বাড়ছে। জামায়াত নারীর নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি।
দলের আমির শফিকুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নারীরা দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না, কারণ তা ইসলামসম্মত নয়। অতীতে বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্ব অস্বীকার করে দেওয়া তার মন্তব্যও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
নীতিপ্রস্তাব ও বিতর্ক
দলটির একটি প্রস্তাব হলো নারীদের কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা থেকে পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা, যাতে তারা পরিবারে বেশি সময় দিতে পারেন; বাকি আয় সরকার ভর্তুকি দেবে। তবে অনেকের মতে, এটি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধিকার সীমিত করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ নারী।
ছাত্রনেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি, যারা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। এতে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন নারী নেতা দল ছাড়েন। তাদের অভিযোগ, এটি আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
নারী প্রতিনিধিত্বে হতাশা
এই নির্বাচনে বড় দলগুলোর মধ্যে নারী নেতৃত্ব নেই। বিএনপির প্রার্থীদের পাঁচ শতাংশেরও কম নারী। জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন নারী প্রধানমন্ত্রী দ্বারা পরিচালিত দেশটিতে এবার নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে কমে গেছে।
সমর্থকদের পাল্টা যুক্তি
জামায়াতের তরুণ প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান দাবি করেন, নারীদের অধিকার নিয়ে আশঙ্কা রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ। তার ভাষ্য, সাধারণ মানুষের কাছে প্রধান চাহিদা নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন। ভবিষ্যতে নারীরা দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতের নারী সমর্থকদের অনেকে বলছেন, ইসলামি আইন দুর্নীতি কমাবে ও নারীর নিরাপত্তা বাড়াবে। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেন, দলটির নেতৃত্বে নারী থাকা উচিত নয়—ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে।
সামনে কোন পথে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম প্রশ্ন বহুদিনের বিতর্ক। নতুন করে ইসলামপন্থী শক্তির উত্থানে এই বিতর্ক আবার তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বহু তরুণ ভোটার পুরোনো দুই দলের রাজনীতিতে ক্লান্ত হয়ে বিকল্প খুঁজছেন। সেই সুযোগেই ইসলামপন্থীরা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
তবে নারীর অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও সামাজিক স্বাধীনতা নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক—দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
















