প্রায় দুই দশক প্রবাসে থাকার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা তারেক রহমান আবারও দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়, যার ধারাবাহিকতায় তারেকের প্রত্যাবর্তন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন
২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আটক থেকে মুক্তির পর চিকিৎসার অজুহাতে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। লন্ডনে অবস্থানকালে তার দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক নেতা কারাবন্দি হন। গত বড়দিনে ঢাকায় ফেরার সময় বিপুল জনসমাগমে তাকে স্বাগত জানানো হয়, যা বিএনপির পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পারিবারিক উত্তরাধিকার ও নতুন উপস্থাপন
তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি। অতীতে তার বিরুদ্ধে সমান্তরাল ক্ষমতার কাঠামো পরিচালনার অভিযোগ উঠেছিল, যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করেছেন। দেশে ফেরার পর তিনি নিজেকে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে দূরে রেখে স্থিতিশীলতা ও সমঝোতার বার্তা দিচ্ছেন।
নীতি ও প্রতিশ্রুতি
তিনি বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য আনার কথা বলেছেন, বিশেষ করে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিনিয়োগ অংশীদার খোঁজার অঙ্গীকার করেছেন। অভ্যন্তরীণভাবে দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা, তৈরি পোশাকনির্ভর অর্থনীতির বাইরে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা দশ বছরে সীমিত রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসন রোধের লক্ষ্যে।
আইনি লড়াই ও ভাবমূর্তি পরিবর্তন
পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি মামলা ও ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় অনুপস্থিতিতে সাজা হয়। তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি খালাস পান। সাম্প্রতিক সময়ে তার নমনীয় ভাষণ, সমঝোতার আহ্বান এবং ব্যক্তিগত জীবনের মানবিক দিক তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি নিজের ভাবমূর্তি নতুনভাবে গড়ে তুলছেন।
দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিএনপির ভেতরে এখন তার নেতৃত্ব কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রার্থী বাছাই, জোট ও কৌশল নির্ধারণে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। দলীয় সূত্র বলছে, এতে সংগঠনে শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস ফিরেছে।
তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বিভক্ত রাজনীতি এবং জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার মুখে তাকে প্রমাণ করতে হবে—ক্ষমতায় গেলে তিনি সংযমী ও জবাবদিহিমূলক শাসন দিতে পারবেন। পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে সুযোগ করে দিলেও প্রকৃত রাজনৈতিক পুনর্গঠন নির্ভর করবে তিনি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক ধারায় নেতৃত্ব দিতে পারেন তার ওপর।
















