বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের দ্বিমুখী লড়াই; এনসিপি-জামায়াত সমঝোতা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছাত্র আন্দোলনের একাংশ
আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী জেন-জি অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম গণতান্ত্রিক ভোট। লাখো তরুণ ভোটার যারা গত গ্রীষ্মে একটি বৈষম্যহীন ও নতুন ধারার রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাদের জন্য এই নির্বাচন এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। একদিকে ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ, অন্যদিকে ক্ষমতার দৌড়ে আবারও সেই পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্য—এই দ্বৈরথ এখন স্পষ্ট। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। তবে সবচেয়ে বড় চমক ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ছাত্রনেতাদের গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর জোট। এক সময়ের বিপ্লবী তরুণদের একটি অংশের ইসলামপন্থীদের সঙ্গে এই রাজনৈতিক সমঝোতা অনেক সাধারণ বিক্ষোভকারী ও নারী অধিকার কর্মীদের মনে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অনুভূতি তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়ন ও পরবর্তীকালে আদালতের রায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসেন অভ্যুত্থানের কারিগর ছাত্ররা, যারা গঠন করেন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)।
কিন্তু নির্বাচনী বাস্তবতায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এনসিপি শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় জোট’-এ শরিক হয়েছে। এই জোটের মোট ২৯৮টি আসনের মধ্যে এনসিপিকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০টি আসন, যেখানে জামায়াত নিজেই লড়ছে ১৭৯টি আসনে। লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমি হোসেনের মতে, বাংলাদেশের সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে টিকে থাকতে এবং সংসদীয় সুরক্ষা পেতেই এনসিপি এই সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। তবে এই জোটে কোনো নারী প্রার্থী না থাকায় নাজিফা জান্নাতের মতো অনেক নারী আন্দোলনকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে একে ‘লজ্জাকর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে তারেক রহমান এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিএনপি এককভাবে ২৮৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ ও ‘মায়ের মর্যাদা’ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা বিশেষ করে নারী ও সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করছে।
এর বিপরীতে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশকে ‘লাল কার্ড’ দেখানো ও প্রগতিশীল শক্তির উত্থানের কথা বলছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই নির্বাচনকে প্রযুক্তিগতভাবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বডি ওর্ন ক্যামেরার মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
তবে নির্বাচনের ঠিক আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তারুণ্যের সেই জুলাই বিপ্লবের বিশুদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বৃহস্পতিবারের ভোটই বলে দেবে, বাংলাদেশ কি প্রকৃতপক্ষেই নতুন পথে হাঁটছে, নাকি আবারও পুরোনো রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে ফিরে যাচ্ছে।
















