লুণ্ঠিত অস্ত্রের ঝুঁকি ও পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা নিয়ে শঙ্কা; সহিংসতাকে ‘অমোঘ নিয়তি’ বলছেন আইজিপি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার মিলিয়ে প্রায় আট লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনী এখন রণপ্রস্তুতি নিয়ে মাঠে। প্রথমবারের মতো ‘সুরক্ষা অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ৫ লাখ ৬০ হাজার আনসার সদস্যের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই গাণিতিক প্রস্তুতির সমান্তরালে জনমনে বিরাজ করছে গভীর উদ্বেগ। ৫ আগস্ট-পরবর্তী লুণ্ঠিত ১,৩৩৩টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার না হওয়া এবং সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনায় পুলিশের ‘নির্বিকার’ ভূমিকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। খোদ পুলিশ প্রধানের (আইজিপি) বয়ানে ফুটে উঠেছে এক রূঢ় বাস্তবতা—প্রার্থীরা যদি তাদের সমর্থকদের শান্ত রাখতে না পারেন, তবে কেবল বন্দুকের জোরে সহিংসতাহীন নির্বাচন নিশ্চিত করা অসম্ভব।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো উদ্ধার না হওয়া আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। টিআইবি-র তথ্যমতে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, যা নির্বাচনী উত্তাপকে সহিংস রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সেনাবাহিনী ও বিজিবি গত এক মাসে শত শত বিদেশি পিস্তল ও বিস্ফোরক উদ্ধার করলেও নিখোঁজ অস্ত্রের বড় একটি অংশ দুষ্কৃতকারীদের হাতে থাকায় ভোটের দিন দুপুরে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর ২,১৩১টি কেন্দ্রের সুরক্ষায় ২৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকলেও, ৫ আগস্ট-পরবর্তী ট্রমা কাটিয়ে তারা কতটা হার্ডলাইনে যেতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
তিনি সতর্ক করেছেন যে, পুলিশ কার্যকর না হলে যৌথ বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে এবং ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সরকারি স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে, ডিএমপি ও পুলিশ সদরদপ্তর দাবি করছে তারা ‘ফুল স্ট্রেংথ’ বা পূর্ণ শক্তিতে প্রস্তুত। দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্বাচনী ডিউটিতে পাঠানো হয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্ত এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারির পাশাপাশি ৩৭ হাজার সদস্যকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় যুক্ত করেছে। তবে আইজিপি বাহারুল আলমের সাম্প্রতিক মন্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, হবু আইনপ্রণেতাদের পারস্পরিক বিবাদ কেন পুলিশকে মেটাতে হবে? তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি না বদলালে আট লাখ বাহিনী দিয়েও শতভাগ মৃত্যুহীন নির্বাচন উপহার দেওয়া কঠিন।
অন্যদিকে, আনসার বাহিনীর ‘সুরক্ষা অ্যাপ’ ও ‘মোবাইল ট্র্যাকিং ফোর্স’ প্রযুক্তিগতভাবে দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক পেশীশক্তির মহড়া মোকাবিলাই হবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
















