নির্যাতক এমডির নিয়োগ বাতিল; চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন প্রধান উপদেষ্টা; এনবিআরের সম্পদ অনুসন্ধান শুরু
রাজধানীর উত্তরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছরের এক গৃহকর্মী শিশুর ওপর বর্বর নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটি জানায়, তাকে দিনের পর দিন টয়লেটে আটকে রেখে খাবার না দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হতো। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণায় সে বাথরুমে থাকা টিস্যু পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা ও গভীর ক্ষত নিয়ে বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে শিশুটি। এই ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সাফিকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করেছে। এছাড়া, অভিযুক্ত দম্পতির অঘোষিত সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে এনবিআরের ট্যাক্স গোয়েন্দা বিভাগ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।
বর্তমানে শিশুটি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরে যে গভীর জখম ও পোড়া ক্ষত পাওয়া গেছে, তা দীর্ঘমেয়াদী এবং পদ্ধতিগত নির্যাতনের প্রমাণ বহন করে।
নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা
হাসপাতালের বেডে শুয়ে শিশুটি যে বর্ণনা দিয়েছে, তা যেকোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো:
- টয়লেট বন্দি: তুচ্ছ কারণে তাকে মারধর করে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। শত কান্না করলেও দরজা খোলা হতো না।
- অখাদ্য গ্রহণ: শিশুটির ভাষায়, “মারধর করে টয়লেটে আটকে রাখলে অনেক কান্না করতাম। ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে টয়লেটে থাকা টিস্যু পেপার ছিঁড়ে খেতাম।”
- শারীরিক সহিংসতা: মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো, যার অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন এখনো টাটকা।
সাফিকুরের নিয়োগ বাতিল ও নতুন এমডি নিয়োগ
নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সরকার কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে:
১. নিয়োগ বাতিল: গত মঙ্গলবার এক অফিস আদেশের মাধ্যমে সাফিকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
২. নতুন নেতৃত্ব: মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়রা সুলতানাকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এমডি ও সিইও পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ
বুধবার সন্ধ্যায় বাণিজ্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহণ উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন হাসপাতালে গিয়ে শিশুটির খোঁজ নেন:
- প্রধান উপদেষ্টার ফোন: পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপদেষ্টাকে ফোন করে শিশুটির চিকিৎসার খোঁজ নেন এবং জানান, সরকার তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় বহন করবে।
- এনবিআরের তদন্ত: সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বীথি আক্তারের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে এনবিআরের ইনকাম ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো অঘোষিত সম্পদ বা অর্থ পাচারের তথ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কৌশলে সই ও মামলার প্রস্তুতি
শিশুটির বাবা জানান, তাকে কাজে দেওয়ার ৮ মাস পর গত ৩১ জানুয়ারি হঠাৎ করে তাকে নিয়ে যেতে বলা হয়। বীথি আক্তার কৌশলে তার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে নেন। মেয়েকে হাতে পাওয়ার পর তার কঙ্কালসার চেহারা ও ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে বাবা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই নৃশংসতার বিচার চেয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
















