সাম্প্রতিক দিনে গাজা বিষয়ক প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রকাশের পর অনেকের কাছেই ত্রিশ বছর আগে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় যুদ্ধের অবসান ঘটানো চুক্তির সঙ্গে এর মিল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিকল্পনা হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
পরিকল্পনার প্রণেতারা ফিলিস্তিনিদের জন্য তথাকথিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক শাসনের কথা বলছেন। বসনিয়াবাসী গত তিন দশক ধরে একই ধরনের ভাষা শুনে আসছে, অথচ সেই মানদণ্ড কী, তা আজও স্পষ্ট নয়। বাস্তবে বসনিয়া একটি আধা অভিভাবকত্বাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যেখানে স্থিতিশীলতার নামে বাইরে থেকে শাসন পরিচালিত হয় এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিহীন শক্তির হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত থাকে।
বসনিয়া যুদ্ধের অবসান ঘটানো ডেটন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়। এতে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর নেতারা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নিলেও সাধারণ নাগরিকরা আলোচনার বাইরে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা পরিকল্পনাও একই যুক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জনগণের সঙ্গে নয়, বরং জনগণকে বাদ দিয়েই শান্তি নিয়ে দরকষাকষি হচ্ছে।
ডেটন চুক্তির ফলে বসনিয়ায় যুদ্ধকালীন ভূখণ্ড বিভাজন বৈধতা পায় এবং একটি অত্যন্ত খণ্ডিত রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। দুটি সত্তা, একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ও একটি আলাদা জেলা নিয়ে গঠিত এই ব্যবস্থায় প্রকৃত ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের হাতে না থেকে আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে চলে যায়।
নামমাত্রভাবে দেশটি মন্ত্রিপরিষদ ও তিন সদস্যের ঘূর্ণায়মান প্রেসিডেন্সির মাধ্যমে পরিচালিত হলেও প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেয় আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বকারী দপ্তর ও পরিষদ। এসব সংস্থা আইন বাতিল বা চাপিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ পর্যন্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে, অথচ তাদের জবাবদিহির কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা নেই।
গাজার জন্য যে শাসন কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে, তাতেও একই ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও জবাবদিহির অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি তথাকথিত শান্তি বোর্ড, দুটি নির্বাহী বোর্ড এবং একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন স্থানীয় কর্তৃত্বের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করবে বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে।
বসনিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিদেশি নিয়ন্ত্রণ শুধু বহিরাগত শক্তির আধিপত্য নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সহযোগিতার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। এতে স্থবিরতা পুরস্কৃত হয় এবং কাঠামোগত পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত হয়। ফল হিসেবে নাগরিক সমাজ সক্রিয় থাকলেও তা মূলত দাতানির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
সমালোচনার কণ্ঠকে প্রায়ই শান্তির জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে বসনিয়ায় আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ সমালোচনাকারী গণমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধ পর্যন্ত করেছে। আজও একই যুক্তি বহাল রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
তবে সম্পূর্ণ নীরবতা ছিল না। ২০১৪ সালে বসনিয়ায় ব্যাপক গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ সরাসরি অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দাবি তোলে। কিন্তু সেই আন্দোলনের ফলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আসেনি। পরে দেশটি থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে চলে যায় এবং জাতীয়তাবাদ শাসনের হাতিয়ার হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সহিংসতা থামানোই প্রকৃত শান্তি নয়। স্বাধীনতা, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ছাড়া শান্তি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বসনিয়ার আধা অভিভাবকত্বের অভিজ্ঞতা একটি সতর্কবার্তা, আদর্শ নয়।
তাদের মতে, বসনিয়ার অতীত বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু গাজার ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে জন্য গাজাবাসী ও অন্যান্য ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে টেকসই শান্তির মূল শর্ত।
















