গাজা সিটি—মিশরের সঙ্গে গাজার রাফাহ স্থলসীমান্ত পরীক্ষামূলকভাবে পুনরায় খোলার ঘোষণার মধ্যেও চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা গাজার হাজারো রোগী ও আহত মানুষ চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। কারা যেতে পারবেন, কতজন যাবেন, কবে যাবেন—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর না থাকায় হতাশা ও উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের আন-নাজলা এলাকায় পরিবারের তাঁবুতে বসে মোবাইল ফোনে খবর দেখেন নেবাল আল-হেসি। এক ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে দুই হাত কনুই পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ২৫ বছর বয়সী এই মা প্রায় দেড় বছর ধরে উন্নত চিকিৎসার আশায় আছেন। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া একটি বাড়িতে গোলা আঘাত হানলে তিনি গুরুতর আহত হন। সেই হামলায় তার দুই হাত বিচ্ছিন্ন হয়, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয় এবং পায়ে আঘাত লাগে। অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘ সময় হাসপাতালে কাটালেও এরপর তাঁবুতে বাস্তুচ্যুত জীবনে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা তিনি পাননি।
নেবাল জানান, দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবকিছুতেই তাকে পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজে খাওয়া, পোশাক পরা বা শৌচাগারে যাওয়া—সবই অন্যের সহায়তায় করতে হয়। দুই বছরের কন্যা রিতাকে কোলে নেওয়া বা তার যত্ন নেওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়। চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছেন, উন্নত কৃত্রিম অঙ্গ বসানোসহ বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দ্রুত দেশের বাইরে যাওয়া জরুরি। তবে সীমান্ত খোলার খবর এলেও তার নাম তালিকায় আছে কি না—সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত বার্তা তিনি পাননি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাজারো আহত ও রোগীর এমন চিকিৎসা প্রয়োজন যা গাজার ভেতরে সম্ভব নয়। নামের তালিকা, অনুমোদন ও সময়সূচি নিয়ে জটিলতার কারণে অনেকেই জানেন না কবে তাদের সুযোগ আসবে। নেবালের মতো অনেককে আগেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এবারও অনিশ্চয়তা কাটেনি। তিনি বলেন, প্রতিদিনই তার কষ্ট বাড়ছে, আর মেয়েটি চোখের সামনে বড় হচ্ছে—তিনি অসহায় হয়ে দেখছেন।
নেবালের মতোই আশায় আছেন ১৬ বছর বয়সী নাদা আরহৌমা। উত্তর গাজার জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত এই কিশোরী গাজা শহরের শেখ রাদওয়ানে একটি তাঁবুতে থাকার সময় শার্পনেলের আঘাতে একটি চোখ পুরোপুরি হারান। মুখের হাড় ভেঙে যায়, চোখের কোটরে মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং টিস্যু ছিঁড়ে যায়। একাধিক অস্ত্রোপচারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। প্রতিদিন ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হয় বলে তার বাবা জানান। হাঁটতেও অন্যের সহায়তা লাগে, এমনকি সুস্থ চোখের দৃষ্টিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নাদার পরিবারের হাতে সরকারি চিকিৎসা রেফারেল থাকলেও সীমান্ত খোলার বাস্তব রূপ কী হবে—তা স্পষ্ট নয়। তার বাবা বলেন, প্রতিবারই শোনা যায় সীমান্ত খুলবে, কিন্তু বাস্তবে কিছুই পরিষ্কার হয় না। তাদের মনে হচ্ছে, এটি যেন বন্দিদের জন্য একটি ফটক—চিকিৎসার পথ নয়।
রোববার রাফাহ সীমান্তে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম দিন খোলার কথা বলা হলেও কীভাবে, কতজন এবং কোন মানদণ্ডে যাতায়াত হবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে এবং গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা বিলম্ব তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, কেবল আগেই অনুমোদিত নামের লোকজনই সীমান্ত পার হতে পারবেন, কিন্তু দৈনিক সংখ্যা বা অগ্রাধিকার মানদণ্ড প্রকাশ করা হয়নি।
ক্যানসার রোগী রায়েদ হামাদও সীমান্ত খোলার দিকে তাকিয়ে আছেন। যুদ্ধ শুরুর আগে তার কিডনির ক্যানসারের চিকিৎসা চলছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়, ওষুধ ও পরীক্ষা না পাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে। এক সময় তার ওজন ছিল ৯২ কেজি, এখন নেমে এসেছে ৬৫ কেজিতে। খান ইউনিসে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করা এই চার সন্তানের বাবা বলেন, গাজায় প্রয়োজনীয় ক্যানসার চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
রাফাহ সীমান্তের এই সীমিত ও অনিশ্চিত খোলার মধ্যে গাজার রোগী ও আহতরা যেন সময়ের সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন। তাদের কাছে প্রতিটি দিন মানে অপেক্ষা, কষ্ট আর অজানা ভবিষ্যৎ।
















