সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) দুই মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় দেশীয় সেনা-শাস্ত্রপ্রতিষ্ঠানকে নানাভাবে দায়ী করার প্রচারণা চলছে—কিন্তু সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলছেন, এর ফলে জাতীয় মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অপপ্রচার রোধে সবাইকে সংযত থাকতে হবে।
জেনারেল (অব.) ইকেবি ১৭ অক্টোবর তার ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থির সময়ে দেশের একমাত্র কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছিল সশস্ত্র বাহিনী। যদিও কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অভিযোগে দাগ লেগেছে, তবুও সমগ্র বাহিনীকে অপবাদ দিয়ে উল্লাস করা জাতির স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করার অন্তর্ভুক্ত বলে তিনি মনে করেন। তিনি আইসিটির স্বাধীনতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন; একই সঙ্গে বলেছেন, সেনাবাহিনীর সংবেদনশীলতা ও মর্যাদার প্রতি তাকিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া এগানো উচিত, যাতে নির্দোষদেরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
গত ৮ অক্টোবর আইসিটি ওই গুম-অপহরণসংক্রান্ত দুই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। দুই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বজনদের নাম থাকার পাশাপাশি মোট ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে; আসামিদের অধিকাংশই সেনা-সংশ্লিষ্ট সাবেক বা বর্তমান কর্মকর্তা। একই সময় সেনা কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এলপিআর যুক্ত একজন ও কর্মরত ১৫ জন কর্মকর্তাকে সেনা হেফাজতে পাঠায়।
এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়েছে—বিদেশে বসে ফেসবুক লাইভে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেড মাসে যাচ্ছে, সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চলছে এবং জনগণকে রাস্তায় নামতে বলা হচ্ছে। ওই গুজব নাকচ করে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, বর্তমান কোনো পরিকল্পনা নেই বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ১১ অক্টোবর জানায়।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নানা প্রশ্ন-উদ্বেগ ও সমালোচনা উঠেছে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, নির্বাচনের আগেই সেনাবাহিনীর মনোবলহানির উদ্দেশ্যে এই অপপ্রচারের সূচনা হচ্ছে। সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, র্যাব ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োজনে যেভাবে দায়িত্ব দেয়া হতো, তাতে সেনা সদস্যদের নৈতিক অবনতি ঘটেছে—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনায়।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ১৫ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ করে সতর্ক করে বলেন, তাদের অনিচ্ছা এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যা প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভারসাম্য নষ্ট করবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যেকোনো ঝুঁকি মেনে নেওয়া হবে না এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
একই সঙ্গে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ ও কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের আলোচনায় বলা হয়েছে, গুম-সংক্রান্ত প্রতিরোধের জন্য অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা ইতিবাচক, কিন্তু সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচারের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত—সরকার এই দায় এড়াতে পারবেন না বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে।
সাবেক সামরিক সদস্যদের সংগঠন এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের নাগরিকদের এবং মিডিয়াকে তৎপর মহলের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের বক্তব্যে বলা হয়, অপরাধীদের বিচারের পক্ষে তারা থাকলেও বিচার হওয়া উচিত স্বচ্ছ প্রমাণ ও সংবিধান ও মানবাধিকার মেনে। সংগঠনটি রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর মর্যাদা রক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, অযথা সেনার ভাবমূর্তি ভাঙার চেষ্টা করা চলবে না।
সেখানে একই সঙ্গে বলা হয়, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত সদস্যদের সম্মানহানি বা মনোবল ভাঙার কোনো চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়; সীমান্তবর্তী বিবেচনায় এ জাতীয় পরিস্থিতি দেশের প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করবে।
কলকাতার কালে ও কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এবং সামাজিক মাধ্যম পোস্টে মন্তব্য করে বলেছেন, অভিযোগকারীদের মধ্যে শুধু সেনা নয়, পুলিশ, র্যাব, সিটিটিসি, ডিটেক্টিভ ব্র্যাঞ্চ, এনএসআই সহ বিভিন্ন সংস্থার লোকও আছে—তারা প্রত্যেকের বিচার হওয়া জরুরি; সার্বিকভাবে প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া উল্লেখ করেছেন, আদালত ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এটি কোনো সংঘাত নয়; এটি আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া ঠিক নয়; এতে সামাজিক বিভেদ বাড়বে এবং সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল হবে, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে রাজনীতিক, সামরিক ও সামাজিক মহলে তর্ক-আলোচনা আগের তুলনায় তীব্র হয়েছে। জোরালোভাবে দাবি করা হচ্ছে—ফৌজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হবে, তবে তা হবে স্বচ্ছ, কার্যকর ও সংবিধান সম্মত প্রক্রিয়ায়; অন্যদিকে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান করা হচ্ছে।
















