ইরানে জানুয়ারির শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় কত মানুষ নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় মোট তিন হাজার একশ সতেরো জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছে। তবে দেশের বাইরে বিভিন্ন সূত্র থেকে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ছত্রিশ হাজারেরও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই বিশাল ব্যবধান শুধু তথ্য যাচাইয়ের জটিলতাই তুলে ধরে না, বরং সমালোচকদের মতে এটি একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়, যার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গাজায় চলমান ইসরায়েলি অভিযানে নিহতদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে আড়াল করার অভিযোগও উঠেছে।
বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন সংগঠন ও গণমাধ্যমে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংগঠন ছয় হাজারের বেশি মৃত্যুর কথা বলেছে এবং আরও বহু ঘটনার যাচাই চলছে বলে জানিয়েছে। তবে এত দ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। কারণ প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে একাধিক সূত্র মিলিয়ে দেখা, স্থান ও সময় যাচাই এবং ভিজ্যুয়াল প্রমাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন হয়।
জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসা সূত্রের বরাতে তার কাছে বিশ হাজার পর্যন্ত মৃত্যুর তথ্যও এসেছে, যেগুলো যাচাই হয়নি।
ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা এবং স্বাধীন তদন্তকারীদের প্রবেশে বাধার কারণে যাচাই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তবুও কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে অত্যন্ত উচ্চ সংখ্যার দাবি প্রকাশ করেছে। একাধিক প্রতিবেদনে ত্রিশ হাজারের বেশি মৃত্যুর কথা বলা হলেও সেগুলোর পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
সমালোচকদের মতে, এসব অতিরঞ্জিত সংখ্যা দ্রুত অন্য গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি বাড়ায়। এর ফলে একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তি জোরালো হয়, অন্যদিকে গাজায় চলমান সহিংসতায় নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রেসিডেন্ট নিহতদের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ভিন্ন ভিন্ন দাবির যাচাইয়ের জন্য একটি প্রক্রিয়া গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন। সরকার বলছে, যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, এতে সন্দেহ নেই। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা হয়তো কখনোই পুরোপুরি নির্ধারণ করা যাবে না। তবুও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রক্রিয়া চালু হলে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মুখোশ উন্মোচন করা যাবে।
তাদের মতে, মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচার শুধু তথ্য বিকৃতিই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের পটভূমি তৈরির ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় সঠিক তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
















