দিল্লিতে এক সকালে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় নিজের লাঞ্চবক্সের জন্য সহজ একটি তরকারি রান্না করছিলেন তানিশা সিং। প্যানে পেঁয়াজ ভাজা শুরু হয়ে গেছে, হঠাৎই তিনি বুঝতে পারলেন টমেটো শেষ। বাইরে গিয়ে সবজি কেনার সুযোগ নেই, কারণ তখনো স্থানীয় সবজিওয়ালারা দোকান খোলেননি।
তানিশা সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোন হাতে নিলেন। দ্রুত ডেলিভারি অ্যাপে টমেটো পাওয়া যাচ্ছে। অর্ডার দেওয়ার আট মিনিটের মধ্যেই দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল। টমেটো পৌঁছে গেছে।
বিশ্বের অনেক জায়গায় এটি বিস্ময়কর মনে হলেও, দিল্লি ও ভারতের অন্যান্য বড় শহরে এটি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। মুদিপণ্য, বই, সফট ড্রিংকস এমনকি কখনো কখনো দামি ইলেকট্রনিক পণ্যও মিনিটের মধ্যে মানুষের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে।
এই দ্রুততার পেছনে রয়েছে ভিন্নধর্মী একটি ব্যবস্থা। বড় সুপারমার্কেট বা দূরের গুদাম নয়, বরং আবাসিক এলাকার ভেতর ছোট ছোট সংরক্ষণকেন্দ্র থেকে পণ্য সরবরাহ করা হয়। এসব কেন্দ্রকে বলা হয় ডার্ক স্টোর। এগুলো সাধারণত গ্রাহকের বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই অবস্থিত, যাতে ডেলিভারি কর্মীরা দ্রুত পৌঁছাতে পারেন।
ডার্ক স্টোরগুলোতে সবকিছু সাজানো থাকে গতি মাথায় রেখে। এখানে কোনো ক্রেতা ঢোকে না, তাই সাজসজ্জা বা প্রদর্শনের প্রয়োজন নেই। সবজি একদিকে, হিমায়িত খাবার অন্যদিকে, আর তাকজুড়ে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।
উত্তর-পশ্চিম দিল্লির এমনই একটি ডার্ক স্টোরে দেখা যায়, অর্ডার স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই কর্মীরা মুহূর্তের মধ্যে পণ্য তুলতে, স্ক্যান করতে ও প্যাক করতে শুরু করেন। পুরো কাজটি এক মিনিটেরও কম সময়ে শেষ হয়।
প্যাকিং শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডেলিভারি কর্মীরা পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সবকিছু এমনভাবে সাজানো যে প্রতিটি সেকেন্ড বাঁচানো যায়।
২৬ বছর বয়সী ডেলিভারি কর্মী মোহাম্মদ ফয়েজ আলম প্রতিদিন এমন অসংখ্য অর্ডার পৌঁছে দেন। একটি অর্ডার পৌঁছে দিতে তিনি প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। সরু গলি, অচেনা রাস্তা, স্পষ্ট ঠিকানার অভাব—সবকিছুর মধ্যেও তাকে দ্রুত গন্তব্য খুঁজে নিতে হয়। অনেক সময় বাড়ির অবস্থান জানতে গ্রাহককে ফোন করতে হয়।
অর্ডার থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে গড়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এই একটি ডেলিভারির জন্য তিনি পান মাত্র কয়েক দশক টাকা। দিনে প্রায় ৪০টি ডেলিভারি শেষ করতে পারলে ভালো আয় হয়, তবে তা নির্ভর করে অর্ডারের সংখ্যা, দূরত্ব ও অ্যাপের দেওয়া প্রণোদনার ওপর।
এই দ্রুতগতির কাজ ভারতের ক্রমবর্ধমান গিগ অর্থনীতির অংশ। আগামী কয়েক বছরে এই খাতে কাজের সুযোগ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই কাজের সঙ্গে রয়েছে অনিশ্চয়তা। ডেলিভারি কর্মীরা কর্মচারী নন, বরং অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। ফলে নেই নির্দিষ্ট বেতন, ছুটি বা সামাজিক সুরক্ষা।
অ্যাপভিত্তিক প্রণোদনা ব্যবস্থার কারণে কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কোনো কারণে কাজের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে প্রণোদনা বাতিল হয়ে যায়। এমনকি ফোন হারিয়ে গেলেও আয় কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ব্যবস্থায় কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে অ্যালগরিদমের হাতে। দ্রুত পৌঁছানোর চাপ, গ্রাহকের অভিযোগ ও রেটিংয়ের ভয় ডেলিভারি কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালাতে বাধ্য করে।
সম্প্রতি বিভিন্ন শহরে ডেলিভারি কর্মীরা আয় কমে যাওয়া ও অনিরাপদ কাজের পরিবেশের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন। এর পর সরকার দ্রুত ডেলিভারির বিজ্ঞাপন ভাষা নিয়ে হস্তক্ষেপ করে।
করোনা মহামারির সময় এই দ্রুত বাণিজ্য খাতের বিস্তার ঘটে। লকডাউন ও ভিড় এড়ানোর কারণে মানুষ ঘরে বসেই সবকিছু অর্ডার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক দেশে পরে এই প্রবণতা কমলেও, ভারতে তা স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ যাতায়াত ও সময়ের অভাবে ভোগা শহুরে মানুষেরা সময় বাঁচানোর জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি। তবে এখনো এই খাত পুরোপুরি লাভজনক হয়নি। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত আরও দ্রুত ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
তানিশার মতো অনেকের কাছেই দ্রুত ডেলিভারি এখন দৈনন্দিন অভ্যাস। তবে তিনি নিজেই বলেন, এই সুবিধার পেছনে যে মানুষের পরিশ্রম রয়েছে, তা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক মানুষই অতিদ্রুত ডেলিভারির বদলে একটু দেরি মেনে নিতে রাজি। এই মানসিকতা বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে আপাতত ভারতের শহরগুলোর গতি মাপা হচ্ছে মিনিটে মিনিটে, আর সেই গতি ধরে রাখতে নিরন্তর ছুটে চলেছেন অসংখ্য ডেলিভারি কর্মী, যাদের থামার সুযোগ খুবই কম।
















