কৃষ্ণ সাগরের তলদেশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রাণঘাতী অস্ত্র। কতগুলো আছে বা ঠিক কোথায় আছে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।
অন্ধকার পানির নিচে বিস্ফোরক ডিভাইসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইউক্রেনীয় নৌবাহিনীর ডুবুরি ভিতালিই বলেন, কাছে গেলে আমাদের খুব শান্ত থাকতে হয়, ধীরে এগোতে হয় এবং নিখুঁতভাবে কাজ করতে হয়। কথা বলার সময় তিনি সাপের মতো করে হাত নাড়েন।
৩১ বছর বয়সী এই নীরব স্বভাবের ডুবুরি কৃষ্ণ সাগরের ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত অংশে মাইন অপসারণের দায়িত্বে থাকা ২০ সদস্যের একটি দলের অংশ।
যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকারগুলোর একটি হলো মাইন। এগুলো দশকের পর দশক সক্রিয় ও প্রাণঘাতী থাকে। সমুদ্রে থাকা মাইন আরও বিপজ্জনক, কারণ সেগুলো স্রোত ও ঝড়ের সঙ্গে ভেসে স্থান বদলাতে পারে।
পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতে, যখন রুশ জাহাজগুলো ওডেসার দিকে এগিয়ে আসে, তখন মস্কো যে নৌমাইন পেতেছিল, সেগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। এই হুমকি কেবল তাত্ত্বিক নয়। গত গ্রীষ্মে ওডেসা উপকূলে মাইনের বিস্ফোরণে তিনজন সাঁতারু নিহত হন।
নৌবাহিনীর মাইন প্রতিরোধ ইউনিটের কমান্ডার, যিনি ফক্স নামেই পরিচিত, ধারণা করছেন নৌমাইনের সংখ্যা হাজারেরও বেশি।
তবে পানির নিচে বিপদ শুধু মাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের সময় ক্ষেপণাস্ত্র, গোলা, বোমা ও স্থলমাইন নদীর স্রোতে ভেসে সমুদ্রে চলে আসে। যেকোনো মুহূর্তে সেগুলোও বিস্ফোরিত হতে পারে।
ফক্স বলেন, অবিস্ফোরিত অস্ত্রের মোট সংখ্যা কয়েক হাজারের তুলনায় বহু গুণ বেশি হতে পারে।
এই কাজ যতটা বিপজ্জনক, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। দূষণের মাত্রা এত বেশি হলেও সমুদ্রপথে চলাচল বন্ধ হয়নি। ইউক্রেনের একমাত্র সামুদ্রিক রপ্তানি করিডর দিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে।
ইউক্রেনের জন্য সমুদ্রতল পরিষ্কার করা বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে কৃষ্ণ সাগরের বন্দরগুলো, বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য, কার্যকর রাখা সম্ভব হচ্ছে। এই বন্দরগুলো দেশটির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রাজস্ব এনে দেয়।
স্থল ও আকাশপথে রাশিয়া কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, সমুদ্রে ইউক্রেন ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।
ওডেসা উপসাগরের ধারে একটি ক্যাফেতে বসে নৌবাহিনীর মুখপাত্র দমিত্রো প্লেতেনচুক সাগরের দিকে ইশারা করে বলেন, এই মুহূর্তে সমুদ্রপথে একটি সমতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা নতুন আঘাতের কৌশল খুঁজি, ওরাও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। আজ যা কাজ করে, কাল তা নাও করতে পারে। দুই পক্ষই একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছে।
রুশ বাহিনীর উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণের কারণে ইউক্রেনীয় জাহাজগুলো ওডেসার আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে না। অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় আকাশ হামলার ঝুঁকির কারণে রাশিয়াও কৃষ্ণ সাগরের বহু নৌঘাঁটি থেকে জাহাজ সরিয়ে নিয়েছে। ২০২৪ সালে ক্রিমিয়া থেকে তাদের শেষ টহল জাহাজও প্রত্যাহার করা হয়।
প্লেতেনচুক বলেন, স্থল ও আকাশে রাশিয়ার সুবিধা থাকলেও, সমুদ্রে তা নেই। এখানে সংখ্যার জোর কাজ করে না। নৌযুদ্ধ মূলত প্রযুক্তিনির্ভর।
এই অচলাবস্থার ফলে ইউক্রেনের সামুদ্রিক রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে এবং শস্য রপ্তানি করিডর চালু আছে। দেশটির কৃষিপণ্যের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি রপ্তানি হয় সমুদ্রপথে, যা প্রায় কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান।
যদিও আকাশ হামলার ঝুঁকি রয়েছে, তবু জাহাজ চলাচল থেমে নেই। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঝুঁকি নিতে রাজি বলেই মনে করেন প্লেতেনচুক।
তবে সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে পানির নিচের হুমকি দূর করা জরুরি। রাশিয়া সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও মাইন ও অবিস্ফোরিত অস্ত্রের মাধ্যমে নৌচলাচল ব্যাহত করতে পারে।
এখানেই ভিতালিইদের মতো ডুবুরিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত ধীরে এগোই, যেন মাইন বিস্ফোরিত না হয়। এক সেকেন্ড নড়ি, তারপর কিছুক্ষণ স্থির থাকি। এভাবে এগোতে এগোতে বস্তুটির কাছে পৌঁছাই। সাধারণত বস্তুটি ২০ মিটার দূরে থাকে, কল্পনা করুন কত সময় লাগে।
ডিমাইনিং শুরুর আগেই বস্তুটি শনাক্ত করতে হয়, কারণ সমুদ্রতলে রুশ নৌমাইনের পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিস্ফোরিত বোমাও রয়েছে।
ফক্স জানান, সাধারণত দুই ধরনের মাইন থাকে। এক ধরনের স্পর্শে বিস্ফোরিত হয়, অন্যটি শব্দ, চাপ বা চৌম্বকীয় পরিবর্তন শনাক্ত করে ফেটে যায়।
বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চৌম্বকীয় মাইনের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। মাইনটি তলদেশে পড়ে থাকে, বড় জাহাজ কাছে এলেই বিস্ফোরিত হয়।
ডুবুরিরা নীরবে কাজ করেন, বিশেষ ধরনের শ্বাসযন্ত্র ব্যবহার করে যাতে কোনো বুদবুদ তৈরি না হয়। মাইন শনাক্ত হলে সাধারণত পরদিন সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। আগে দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেন্সর অকার্যকর করা হয়, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মাইন সরানো হবে নাকি সেখানেই ধ্বংস করা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় দুই দিন সময় লাগে, একাধিক নৌকা ও ২০ জনের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন হয়। সব সময়ই রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা থাকে, যা মাইন বিস্ফোরিত করতে পারে।
এয়ারস্ট্রাইকের সময় জিপিএস সংকেত ব্যাহত হয়, ফলে সোনার ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হয়। সক্রিয় যুদ্ধের মাঝখানে সমুদ্র ডিমাইনিং আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফক্স বলেন, সবকিছুই ভুল হতে পারে।
ভিতালিই স্মরণ করেন, একবার মাইনের দিকে এগোতে গিয়ে সোনারে আরেকটি নড়াচড়া ধরা পড়ে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন সেটি রুশ ডুবো ড্রোন। পরে দেখেন কয়েকটি ডলফিন সাঁতরে যাচ্ছে। দৃশ্যটি সুন্দর হলেও সেই মুহূর্তে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
প্লেতেনচুক জানান, ২০২৫ সালে তাদের দল ৫০টির বেশি মাইন নিষ্ক্রিয় করেছে, যা মোট সংখ্যার তুলনায় খুবই সামান্য।
২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য ইউক্রেনকে দুটি মাইন অনুসন্ধানী জাহাজ দিলেও, বড় জাহাজ সহজ লক্ষ্য হওয়ায় সেগুলো এখনো ব্যবহৃত হয়নি। যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো মোতায়েনের সম্ভাবনা কম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সমুদ্রতল পরিষ্কার করতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে বলে মনে করেন ভিতালিই।
তবু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সামুদ্রিক রপ্তানি ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আর তাই ভিতালিইদের মতো ডুবুরিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার পানির নিচে নামবেন, এক সেকেন্ড করে এগিয়ে, তারপর আবার অপেক্ষা করে।
















