অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের দুর্গম বনাঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত ছোট্ট শহর লিকোলা। জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ। কয়েকটি পুরোনো কাঠের ভবন, একটি জেনারেল স্টোর, ক্যারাভান পার্ক ও একটি পেট্রোল পাম্প নিয়ে গড়ে ওঠা এই শহরটি এখন বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মেলবোর্ন থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার গাড়ি পথ দূরে অবস্থিত লিকোলা দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের এলাকার মানুষ ও আলপাইন ন্যাশনাল পার্কে যাতায়াতকারী পর্যটকদের জন্য খাবার, জ্বালানি ও বিশ্রামের নির্ভরযোগ্য জায়গা হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ দশক ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও তরুণদের জন্য বিভিন্ন শিবির ও কর্মসূচির আয়োজন করা হতো এখানে।
শহরটির মালিকানা একটি দাতব্য কমিউনিটি সংগঠনের হাতে থাকলেও স্থানীয় লায়ন্স ক্লাব জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও লোকসানের কারণে তারা আর এই শহর পরিচালনা করতে পারছে না। ফলে গত বছরের শেষ দিকে নীরবে অনলাইনে পুরো শহরটি বিক্রির তালিকায় তোলা হয়।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন লিকোলার একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা লিয়েন ও’ডনেল। তিনি ২০২২ সালে শহরের জেনারেল স্টোরের ব্যবসা কেনেন এবং সেখানে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। তার দাবি, দীর্ঘমেয়াদি লিজ বাড়ানো হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন লিজ নবায়ন না করে তাকে দোকান ও বাসস্থান ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ও’ডনেল বলেন, লিকোলা তার কাছে শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, বরং মানুষের জন্য একটি দ্বিতীয় বাড়ির মতো। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে ট্রাকচালক ও জরুরি সেবাদানকারীদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। শহরটি কোনো বাণিজ্যিক প্রকল্পে রূপ নিলে তার হৃদয় ভেঙে যাবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি জানতে পারেন শহরটি বিক্রির পথে। তখন তিনি তহবিল সংগ্রহসহ নানা উপায়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কয়েক মিলিয়ন ডলার ছাড়া কিছুই করার নেই। শেষ পর্যন্ত তাকে জানানো হয়, জমি ও ভবনের মালিকানা বোর্ডের হওয়ায় তাকে সরে যেতে হবে।
ডিসেম্বরে অনলাইনে প্রকাশিত বিক্রির বিজ্ঞাপনে শহরটির মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ছয় থেকে দশ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর আশপাশের এলাকার মানুষ, পর্যটক ও লায়ন্স ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দোকান বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয়দের বড় সমস্যায় পড়তে হবে বলে মন্তব্য করেন।
লিকোলার জেনারেল স্টোর ও ক্যারাভান পার্ক বাঁচানোর দাবিতে একটি অনলাইন পিটিশনে ইতোমধ্যে আট হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। একই সঙ্গে লায়ন্স ক্লাবের ভেতর থেকেও অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে লায়ন্স ভিলেজ লিকোলা বোর্ড বলছে, দীর্ঘ পর্যালোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, বাড়তি ব্যয়, বীমা খরচ বৃদ্ধি, পুরোনো অবকাঠামো ও শিবিরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় শহরটি আর টেকসই নয়। বিক্রির অর্থ দিয়ে নতুন একটি তহবিল গঠন করে ভিক্টোরিয়াজুড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিবিরে পাঠানোর কাজ চালু রাখা হবে।
লিকোলায় ভবিষ্যতে শিবির কার্যক্রম চলবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। নতুন মালিক কে হবেন বা শহরটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নও রয়ে গেছে। তবে বোর্ড জানিয়েছে, সম্পত্তিটি কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকেই।
এর মধ্যেই স্থানীয়দের আশঙ্কা, লিকোলা হয়তো তার পরিচিত রূপ হারাবে। আর সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই শহরের মানুষ নিজেদের জায়গা ও পরিচয় রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
















