১৭ বছরের নির্বাসন শেষে প্রত্যাবর্তন, ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে জল্পনা
জনপ্রিয়তা যেমন উচ্চ, তেমনি রয়েছে অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন
১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা তারেক রহমান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত নাম। কণ্ঠ আগের মতো দৃঢ় নয়, শরীরও পুরোপুরি সুস্থ নয়—তবু শেখ হাসিনার পতনের পর ছাত্র–জনতার আন্দোলনে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি নিজেকে তুলে ধরছেন এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে।
একদিকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ‘জেন–জি’ তরুণদের নতুন আকাঙ্ক্ষা—এই দুই ধারার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান। ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরার সময় বিমানবন্দরে লাখো মানুষের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, তিনি কেবল একটি দলের নেতা নন; বরং সম্ভাব্য ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছেন। পাঁচ দিনের মাথায় তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর মৃত্যু সেই প্রত্যাবর্তনকে আরও আবেগময় করে তোলে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠনের দৌড়ে তারেক রহমানই সবচেয়ে এগিয়ে। ডিসেম্বরের এক জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর জনসমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর সমর্থন প্রায় ১৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
তবে এই জনপ্রিয়তার নিচে রয়েছে গভীর শঙ্কাও। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় বাংলাদেশ একাধিক বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ছিল—এই স্মৃতি আজও সংস্কারপন্থিদের ভাবিয়ে তোলে। জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগ যেন আরেকটি আত্মকেন্দ্রিক শাসনে পর্যবসিত না হয়—এই উদ্বেগও স্পষ্ট।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান অবশ্য দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার বিরুদ্ধে দেওয়া আগের রায় বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সমালোচকদের একাংশ বলছেন, তিনি সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অংশ, যার বিরুদ্ধে মানুষ রাজপথে নেমেছিল।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জ সামনে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার মানের অবনতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ যুব বেকারত্ব—প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমান বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
তার পরিকল্পনায় রয়েছে খাল খনন, গাছ লাগানো, ঢাকায় সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যখাতে অংশীদারিত্ব। তার ভাষায়, “আমি যদি ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।”
জুলাই আন্দোলনের পর দেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স এবং অনলাইনভিত্তিক হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। তারেক রহমান বলছেন, তার প্রথম অগ্রাধিকার আইনের শাসন—মানুষ যেন নিরাপদে চলাফেরা ও ব্যবসা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য এবং ভূরাজনৈতিক চাপ—সবই আগামী সরকারের বড় পরীক্ষা। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিমূলক শাসনই এখন জনগণের প্রত্যাশা।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে তারেক রহমান দাঁড়িয়ে আছেন এক বড় পরীক্ষার সামনে—ক্ষমতার উচ্চতার সঙ্গে দায়িত্বের ভারও যে সমানভাবে বাড়ে, সেটিই হয়তো তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
















