১ হাজার ৪৯৯ মামলায় ১০ লাখ আসামি; গ্রেপ্তার আতঙ্কে কারখানা ছাড়ছেন উদ্যোক্তারা
বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের বেসরকারি শিল্প খাতে এক নতুন আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘মামলা বাণিজ্য’। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনাকে পুঁজি করে অসাধু চক্র ও মব সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের হত্যা মামলায় আসামি করছে।
অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের লক্ষ্যেই এসব কাল্পনিক মামলা সাজানো হচ্ছে; যেখানে বাদী খোদ আসামিকে চেনেন না। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, অন্তত ১ হাজার ৪৯৯টি মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, যার মধ্যে অন্তত ২ হাজার জনই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এই ‘মামলা বাণিজ্যের’ কারণে অনেক শীর্ষ উদ্যোক্তা বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন কিংবা গ্রেপ্তারের ভয়ে প্রতিষ্ঠানে আসছেন না। ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে সাপ্লাই চেইন, যা অদূর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ ধসের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের পক্ষ থেকে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হলেও গত ১৭ মাসেও এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো মিথ্যা মামলার হুমকি দিয়ে ‘দেনদরবার’ করার এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
যেভাবে চলছে মামলার ‘চাঁদাবাজি’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলা বাণিজ্যের কৌশলগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত:
- অজ্ঞাতনামা বাদী ও নেতাদের তালিকা: অনেক ক্ষেত্রে মামলার বাদী নিজেই স্বীকার করছেন যে, তিনি আসামিকে চেনেন না; কেবল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া তালিকায় স্বাক্ষর করেছেন।
- দেনদরবার ও হুমকি: কোনো কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই আদালতের মাধ্যমে হত্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। ধানমন্ডি ও পল্টন থানায় এমন বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রমাণ মিলেছে।
- একই এজাহার, ভিন্ন নাম: অধিকাংশ মামলার এজাহারের ভাষা প্রায় একই। প্রথম কয়েকজনকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে পরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অরাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী আঘাত
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই পরিস্থিতির ফলে দেশের অর্থনীতি তিনটি বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে:
১. বিনিয়োগ স্থবিরতা: মালিকরা আতঙ্কে থাকায় নতুন বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কথা ভাবছে।
২. শ্রমিক অসন্তোষ: মালিকরা বিদেশে বা আত্মগোপনে থাকায় অনেক কারখানায় বেতন-ভাতা প্রদানে বিলম্ব হচ্ছে, যা থেকে যেকোনো সময় বড় ধরণের শ্রমিক বিক্ষোভের আশঙ্কা রয়েছে।
৩. রপ্তানি হ্রাস: পোশাক খাতের শীর্ষ নেতাদের নামে মামলা হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা (Buyers) বাংলাদেশে কার্যাদেশ দিতে দ্বিধাবোধ করছেন।
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, “ব্যবসায়ীদের কোনো নির্দিষ্ট দল নেই। তাদের কাজ চাকা সচল রাখা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে।” বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক রাজীব চৌধুরী মনে করেন, এই সংকটের একমাত্র সমাধান সরকারের হাতে। সরকার কঠোর না হলে কয়েক মাসের মধ্যে অনেক বড় বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।
আইনজীবীদের পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকার প্রশ্ন
আইনজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও তাকে দূরবর্তী স্থানের কোনো হত্যা মামলায় আসামি করা আইনের শাসনের পরিপন্থি। দোহারের এক ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, গত ১০ বছর ওই এলাকায় না গেলেও তাকে হত্যা মামলার আসামী করা হয়েছে। এটি কেবল হয়রানি নয়, বরং শিল্প খাত ধ্বংসের এক গভীর ষড়যন্ত্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসন ঢালাও মামলার বিষয়টি স্বীকার করলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এখন সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছেন।
















