যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে সত্তরের দশকে ঘটে যাওয়া এক বিস্ময়কর যৌন কেলেঙ্কারি দেশটির ইতিহাসে আলোচিত একটি বিচারপ্রক্রিয়ার জন্ম দেয়। ঘটনাটির কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন লিবারেল পার্টির নেতা জেরেমি থর্প, যিনি একসময় ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর পথে এগোচ্ছিলেন।
জেরেমি থর্পের সঙ্গে এক পুরুষ মডেলের গোপন সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের ভেতরে জানা থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসেনি। সে সময় সমকামিতা আইনত অপরাধ ছিল, ফলে বিষয়টি নিয়ে নীরবতা বজায় রাখা হয়। তবে পরিস্থিতি পাল্টে যায় ১৯৭৬ সালের ২৯ জানুয়ারি, যখন একটি ছোট আদালত শুনানিতে থর্পের সাবেক প্রেমিক নরম্যান স্কট হঠাৎ চিৎকার করে জানান, তিনি জেরেমি থর্পের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে ছিলেন এবং এ কারণেই তাকে নানা ভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
এই বক্তব্য আদালতে প্রকাশ্যে দেওয়ায় সংবাদমাধ্যম আইনি বাধা ছাড়াই ঘটনাটি প্রকাশ করতে পারে। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় এমন এক কাহিনি, যা বাস্তবের চেয়েও নাটকীয় বলে মনে করা হয়।
থর্প ছিলেন অভিজাত ইটন কলেজে শিক্ষিত এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। তরুণ বয়সেই তিনি ব্যারিস্টার হন এবং ৩০ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দ্রুতই তিনি লিবারেল পার্টির উজ্জ্বল মুখে পরিণত হন। কিন্তু এই সফল রাজনৈতিক জীবনের আড়ালে ছিল তার গোপন ব্যক্তিগত জীবন, যা প্রকাশ পেলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে পারত।
নরম্যান স্কট ছিলেন সাধারণ পরিবারের ছেলে। ঘোড়ার দেখাশোনার কাজ করতে গিয়ে থর্পের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আর্থিক সংকট ও মানসিক সমস্যায় ভুগলেও থর্প তাকে সহায়তা করতেন, দামি পোশাক কিনে দিতেন এবং প্রভাবশালী মহলে পরিচয় করিয়ে দিতেন। তাদের সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে স্কটের কাছে থাকা চিঠিগুলো পরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে স্কট সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলেও বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। হতাশাগ্রস্ত স্কট পুলিশের কাছে নিজের বক্তব্য দেন এবং থর্পের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানান। তবে সে সময় কেউই বিশ্বাস করতে রাজি হয়নি যে এমন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সত্য হতে পারে।
এর মধ্যেই যুক্তরাজ্য একের পর এক যৌন ও গুপ্তচর কেলেঙ্কারিতে আলোড়িত হচ্ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র আরেকটি কেলেঙ্কারি এড়াতে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কিন্তু স্কট থামেননি। তিনি থর্পের পরিবারকেও চিঠি লেখেন, যা থর্পকে আতঙ্কিত করে তোলে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে থর্পের এক সহযোগী স্কটকে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তবুও অভিযোগ ও গুঞ্জন থামেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে স্কটকে ভয় দেখানোর একটি পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন অ্যান্ড্রু নিউটন নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা হিসেবে পরিচয় দেন।
এক রাতে নির্জন এলাকায় গাড়ি থামিয়ে নিউটন স্কটের সঙ্গে থাকা কুকুরটিকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে স্কট জানান, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাকেও হত্যা করা হতে পারে, কিন্তু বন্দুক জ্যাম হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় নিউটন কারাদণ্ড পান।
এর কয়েক মাস পর আদালতে একটি মামলার শুনানিতে স্কট আবারও থর্পের সঙ্গে সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে বলেন। এরপর বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তদন্ত জোরদার হয়। থর্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পিটার বেসেলও পরে সব কথা প্রকাশ করেন।
চাপের মুখে থর্প লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। পরে নিউটন দাবি করেন, তাকে স্কটকে হত্যার জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্তের পর থর্প ও তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা হয়, যা সংবাদমাধ্যমে শতাব্দীর বিচার হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৯৭৯ সালের নির্বাচনে থর্প তার আসন হারান। বিচারে বিচারক সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং শেষ পর্যন্ত জুরি থর্পকে নির্দোষ ঘোষণা করে। রায়ের পর থর্প বলেন, তিনি সব সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এসেছেন এবং রায়কে সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত মনে করেন।
বিচারের পর নরম্যান স্কট আড়ালে চলে যান। বহু বছর পরে তিনি আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। জেরেমি থর্প রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে থাকেন এবং ২০১৪ সালে তার মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এই ঘটনা যদি ভিন্ন সময়ে ঘটত, তাহলে সমাজের প্রতিক্রিয়া হয়তো আরও সহনশীল হতো।
















