কিয়েভ, ইউক্রেন – যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনার পরও রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে প্রস্তুত নয় বলে মনে করছেন ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ। শীতকালজুড়ে অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং তীব্র ঠান্ডার মধ্যে দিন কাটাতে কাটাতে ইউক্রেনবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্লান্তি আরও গভীর হয়েছে।
কিয়েভের এক আন্ডারপাসে ফুল বিক্রি করা ৩৪ বছর বয়সী স্নিজানা পেত্রাদখিনা বলেন, হাত গরম রাখার যন্ত্রই এখন তার ভরসা। তিনি বলেন, ঠান্ডা আর অন্ধকারে থাকতে থাকতে সবাই ক্লান্ত। ইউক্রেনের মানুষ চায় শান্ত রাত, যেখানে ড্রোন বা বিস্ফোরণের শব্দ থাকবে না এবং শিশুরা নিরাপদে ঘুমাতে পারবে।
এই শীতে রাশিয়া বারবার ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এতে কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। প্রতিদিন বেজে ওঠা বিমান হামলার সাইরেনেও এখন অনেকেই আর আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখান না। প্রায় চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর ক্ষয়যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
আবুধাবিতে ইউক্রেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের আলোচনার পর কূটনৈতিক ভাষায় আশাবাদী মন্তব্য শোনা গেলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয়ই বেশি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা ইগর নভিকভ বলেন, আলোচনা হওয়া ভালো, কিন্তু স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী নন। তার মতে, যুদ্ধ তখনই শেষ হতে পারে, যদি রাশিয়া নিজে সিদ্ধান্ত নেয় অথবা মস্কোর ওপর এমন চাপ তৈরি হয়, যাতে তারা বাধ্য হয়।
তিনি মনে করেন, বসন্তের আগে এমন কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। রুশ প্রেসিডেন্ট মানুষের সহনশীলতা ভাঙতে চাইছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে ক্লান্তি সত্ত্বেও ইউক্রেনের মানুষ বারবার নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আবুধাবির বৈঠকে ইউক্রেনের পক্ষে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, আলোচনায় যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে কথা হয়েছে এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তদারকি প্রয়োজনীয়। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, অগ্রগতির মানসিকতা থাকলেই কেবল পরবর্তী বৈঠক সম্ভব।
আলোচনার আগের রাতেই কিয়েভের দিকে শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে রাশিয়া। এতে গভীর রাতে মানুষকে অন্ধকারে মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নিতে হয়।
২০ বছর বয়সী বারটেন্ডার মাকসিম ফোমিন, যিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বলেন শুরুতে যুদ্ধ তাকে ভয় পাইয়ে দিত, এখন তিনি অনেকটাই অনুভূতিহীন। বিদেশি শক্তির ওপর তার ভরসা কম। তিনি বলেন, চার বছর যুদ্ধের পর তিনি চাকরি ছেড়ে সরাসরি সম্মুখসারিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারণ তরুণদেরই দেশ ও ভূমি রক্ষা করতে হবে।
পোলতাভার বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী কাটারিনা বলেন, যুদ্ধের শুরুতে মানুষের মধ্যে ঐক্য ছিল, প্রতিবেশীরা একে অপরকে সাহায্য করত। এখন দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কে জেনারেটর ব্যবহার করবে তা নিয়ে ঝগড়াও হচ্ছে। তার ভাষায়, মানুষ খুব ক্লান্ত, তারা স্বাভাবিক জীবন চায়।
কিয়েভের একটি প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ওলেকসান্দ্র খারা বলেন, প্রকৃত আলোচনা তখনই সম্ভব, যখন রাশিয়ার পক্ষ থেকে সত্যিকারের সমঝোতার ইচ্ছা থাকবে। তার মতে, রাশিয়া নিজেকে শক্ত অবস্থানে দেখছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের নরম অবস্থান তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনের প্রকৃত মিত্র নয়, কেবল অংশীদার আছে, যাদের মধ্যে পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলো তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য।
কিয়েভের অন্ধকার আন্ডারপাসে দাঁড়িয়ে স্নিজানা পেত্রাদখিনা বলেন, তিনি চান যুদ্ধ শেষ হোক, সন্তান নিরাপদ থাকুক, স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসুক। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, যে ভূমির জন্য এত মানুষ প্রাণ দিয়েছে, তা ছেড়ে দেওয়া তিনি মেনে নিতে পারেন না। এই দ্বন্দ্বই এখন বহু ইউক্রেনবাসীর বাস্তবতা।
















