ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টিগ্রে অঞ্চলে ভয়াবহ খাদ্যসংকট ও মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ার এক বছর পরও এখানকার মানুষের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মানবিক সহায়তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
এরিত্রিয়া সীমান্তঘেঁষা হিটসাটস গ্রামের ৮৮ বছর বয়সী নিড়ায়ো ওবেট এখন দিনের বড় একটি সময় কাটাচ্ছেন বন্ধু ও স্বজনদের কবর দিতে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই অবস্থায় নিজের মৃত্যুর পর তাঁকে দাফনের জন্যও কেউ থাকবে কি না, তা নিয়েই দুশ্চিন্তা করছেন। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ নয়, শেষ পর্যন্ত আমাদের মেরে ফেলবে দুর্ভিক্ষ।
টিগ্রে যুদ্ধ শুরুর পর ২০২০ সালে নিজ এলাকা হুমেরা ছেড়ে পালিয়ে হিটসাটসে আশ্রয় নেন ওবেট। যুদ্ধ শেষ হলেও তিনি আর নিজের ঘরে ফিরতে পারেননি। এই গ্রামটি বহুদিন ধরেই মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থার সহায়তা ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সহায়তা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, টিগ্রে অঞ্চলের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ জরুরি সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সহায়তা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা সহায়তাদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তহবিল সংকটে স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
হিটসাটসে বাস্তুচ্যুত আরেক বাসিন্দা তেরফুনেহ ওয়েলদেরুফায়েল বলেন, গত এক বছরে ক্ষুধার কারণে প্রিয়জন হারাননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সরকারি শিবিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে এখন আর আলাদা করে হিসাব রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে নিকটবর্তী শিরে এলাকায় খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। কিছু সহায়তা পুনরায় চালুর ঘোষণা এলেও টিগ্রের মতো অঞ্চলে তার প্রভাব খুব সামান্য বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাঁদের মতে, এত মানুষের চাহিদার তুলনায় যা আসছে, তা মরুভূমিতে এক গ্লাস পানি ঢালার মতো।
এই সংকটে কিছু ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উদ্যোগে সহায়তা সংগ্রহের চেষ্টা হলেও কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দেয়। সরকারিভাবে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি অস্বীকার করা হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, লাখো মানুষ এখনও চরম খাদ্যঝুঁকিতে রয়েছে।
হিটসাটসের বৃদ্ধা আলমাজ গেব্রেজেদেল জানান, সাহায্যের জন্য মানুষ এখন হোটেল বা দোকানের উচ্ছিষ্টের ওপর নির্ভর করছে। তাঁর প্রতিবেশী মার্তা তাদেসে দীর্ঘদিন অসুস্থ ও অপুষ্টিতে ভুগছেন। তিনি বলেন, ওষুধের চেয়েও এখন খাবারই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতা জানান, গ্রামে কবরস্থানের জায়গাও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছেন।
নিড়ায়ো ওবেটের কণ্ঠে তাই শুধু অপেক্ষা। তিনি বলেন, সহায়তা না এলে তাঁর মতো অনেকেই খুব শিগগিরই হারিয়ে যাবেন। তাঁর কথায়, এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।













