এক ব্যাংকের আমানত অন্য ব্যাংকের মূলধন; ৩ হাজার কোটি টাকা লোকসানের মুখে বিনিয়োগকারীরা
দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত ‘সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড’ এখন খোদ খাতের জন্যই বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলো বাইরে থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পেরে নিজেদের মধ্যেই ‘চক্রাকার পদ্ধতিতে’ (Circular Subscription) একে অপরের বন্ড কিনছে। এতে কাগজে-কলমে মূলধন অনুপাত শক্তিশালী দেখালেও বাস্তবে কোনো নতুন অর্থ যুক্ত হচ্ছে না। ফলে একটি ব্যাংক ব্যর্থ হলে তার ধাক্কা সরাসরি অন্য ব্যাংকের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা ৫টি দুর্বল ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর প্রায় ৩,৯০০ কোটি টাকা দেনা রয়েছে, যার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত আদায় করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। আমানতের মতো বিমা সুরক্ষা না থাকায় এই বন্ডে বিনিয়োগ করা হাজার কোটি টাকা এখন কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে।
ব্যাংকের প্রধান কাজ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হলেও বন্ডের এই ‘ক্রস-বাইং’ কালচার ঝুঁকি কমানোর বদলে পুরো ব্যবস্থাকে এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে ফেলেছে। ২০২২ সালের পর গত তিন বছরে ইস্যু করা বন্ডের প্রায় ৮০ শতাংশই কিনেছে অন্য ব্যাংকগুলো।
‘চক্রাকার পদ্ধতি’ ও কৃত্রিম মূলধন
বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি এক ব্যাংকের বন্ড অন্য ব্যাংক কেনা (Cross-buying) নিষিদ্ধ করলেও ব্যাংকগুলো আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ‘সার্কুলার পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে।
- প্রক্রিয়া: ব্যাংক ‘এ’ বন্ড বিক্রি করে ব্যাংক ‘বি’-এর কাছে, ‘বি’ বিক্রি করে ‘সি’-এর কাছে এবং ‘সি’ ঘুরে এসে ব্যাংক ‘এ’-এর বন্ড কেনে।
- প্রভাব: ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্টস অব বাংলাদেশের (ICAB) সাবেক সভাপতি এ এফ নেসারউদ্দিনের মতে, এর ফলে একটি ব্যাংকের আমানত মূলত অন্য ব্যাংকের মূলধন হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে, যা মূলধনের গুণগত মানকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দুর্বল বন্ড বাজার ও বিকল্পহীন ব্যাংক
কেন ব্যাংকগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল? বিশ্লেষকরা এর পেছনে তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. বিনিয়োগকারীর আকাল: সাধারণ মানুষ ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে টাকা আটকে রাখতে আগ্রহী নয়।
২. ট্রেজারি বন্ডের দাপট: বর্তমানে ঝুঁকিমুক্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফা ব্যাংক বন্ডের চেয়ে বেশি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সেদিকেই ঝুঁকছেন।
৩. আস্থার সংকট: বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় শেয়ার বাজারেও এসব বন্ডের চাহিদা খুবই সীমিত।
ঝুঁকির মুখে ৩ হাজার কোটি টাকা
২০২৫ সালে এসে ৫টি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তের পর বন্ডের ঝুঁকিটি প্রকাশ্যে আসে।
- দেনার পরিমাণ: এই ৫টি ব্যাংকের মধ্যে ৪টির কাছে ৩,৯০০ কোটি টাকার মুদারাবা সাবঅর্ডিনেটেড ও পারপেচুয়াল বন্ড রয়েছে।
- সুরক্ষাহীন বিনিয়োগ: আমানতকারীদের টাকা যেমন নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিমা করা থাকে, বন্ডের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুরক্ষা নেই। ব্যাংক দেউলিয়া হলে সাধারণ আমানতকারী ও বড় ঋণদাতাদের পাওনা মেটানোর পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবেই বন্ডহোল্ডাররা টাকা পাবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান স্বীকার করেছেন যে, আমানতকে মূলধন হিসেবে দেখানো ভালো কোনো লক্ষণ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন চেষ্টা করছে যেন ব্যাংকগুলোর পরিবর্তে কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের অংশ বাড়ানো যায়। অন্যদিকে, বিএসইসি মুখপাত্র আবুল কালাম মনে করেন, প্রকৃত মূলধন বাড়াতে হলে ছোট সঞ্চয় ও কর্পোরেট তহবিলকে বন্ডের বাজারে নিয়ে আসা জরুরি।
সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি আসিফ খানের মতে, এই চর্চা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল নির্দেশনার পরিপন্থী। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও সক্রিয় বন্ড বাজার গড়ে না উঠবে, ততক্ষণ ব্যাংকিং খাতের এই ‘কাগুজে সুরক্ষা’র ঝুঁকি থেকেই যাবে।
















