ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতৃত্বে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই প্রথম দলের সভাপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হলো, যিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠেননি। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে নীতিন নবীনের এই উত্তরণ বিজেপির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
নীতিন নবীন সংঘের শাখা থেকে উঠে আসেননি, সংঘের আদর্শিক পরিমণ্ডলেও তাঁর বড় হওয়া নয়। তবু তাঁকেই দলের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদে বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আগামী দিনে বিজেপির নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনায় নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর ইচ্ছাই হবে মুখ্য। দল ও সরকার—দুই ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন তাঁরা।
গত এক বছর ধরে বিজেপির সভাপতি নির্বাচন ঘিরে সংঘ ও মোদি–শাহ জুটির মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। সংঘ চাইছিল এমন একজনকে, যিনি তাদের আদর্শে গড়া এবং সেই চেতনায় দল চালাবেন। বিপরীতে মোদি ও শাহ এমন একজন অনুগত নেতৃত্ব খুঁজছিলেন, যাঁর মাধ্যমে দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা সহজ হবে। শেষ পর্যন্ত এই অদৃশ্য দ্বন্দ্বে জয়ী হয়েছেন মোদি–শাহ। নীতিন নবীনের নির্বাচন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তিন বছরের জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হয়েছেন নীতিন। এর অর্থ, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি তাঁর নেতৃত্বেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেবে, যদিও মূল কৌশল নির্ধারণ করবেন মোদি ও শাহই।
নীতিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের শিকড় বিহারে। অবিভক্ত বিহারের ঝাড়খন্ড অংশে তাঁর জন্ম। জাতভিত্তিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তিনি উচ্চবর্ণ কায়স্থ সম্প্রদায়ের। তাঁর বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহা ছিলেন বিজেপির বিধায়ক। বাবার মৃত্যুর পর ২০০৬ সালে নীতিন রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সেই অর্থে তিনি পরিবারভিত্তিক রাজনীতির ধারারই অংশ, যা নিয়ে বিজেপি অতীতে অন্য দলগুলোর সমালোচনা করে এসেছে।
দীর্ঘদিন নীতিন জাতীয় রাজনীতিতে খুব পরিচিত মুখ ছিলেন না। তবে তিনি নীতীশ কুমারের মন্ত্রিসভায় সড়ক, নগরোন্নয়ন ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের আগে অমিত শাহ তাঁকে সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। বিহারের বাইরে ছত্তিশগড় ও দিল্লির নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাতেও তাঁকে কাজে লাগানো হয়। এসব দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নীতিন তাঁর বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়েছেন।
বিহার নির্বাচনে বড় জয়ের পর তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়ে যায়। নির্বাচনে সাফল্যই রাজনীতির প্রধান মানদণ্ড—এই বাস্তবতায় সংঘ পরিবারও মোদি–শাহ জুটির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। নীতিনের সভাপতি হওয়া কার্যত দেখিয়ে দিল, দল ও সরকার পরিচালনায় সংঘের চেয়ে মোদি–শাহর কর্তৃত্বই চূড়ান্ত।
নীতিনের আগে সম্রাট চৌধুরীকেও সামনে এনে একই বার্তা দেওয়া হয়েছিল। বিহারে তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্রাট অতীতে আরজেডির নেতা ছিলেন, তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংঘের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবু বাস্তববাদী রাজনীতির স্বার্থে তাঁকে বিজেপিতে তুলে এনে বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়। আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো নীতিন ও সম্রাট—এই ধারারই অংশ।
নীতিন নবীনকে সভাপতি করার মাধ্যমে বিজেপি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত দিয়েছে। বিহারে অনগ্রসর শ্রেণির ভোট ধরে রাখতে টিকিট বণ্টনে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল। এতে উচ্চবর্ণ ভোটারদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়। কায়স্থ নীতিনকে সর্বভারতীয় সভাপতি করে সেই শঙ্কা প্রশমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নীতিনের সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা পশ্চিমবঙ্গ। ইতিমধ্যেই তিনি সেখানে সংগঠনিক সফরের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। রাজ্যে মোদি–শাহর কৌশল বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁর ওপর। তবে সবাই জানে, জিতলে কৃতিত্ব যাবে মোদি–শাহর ঝুলিতে, আর হারলেও দায়ভার তাঁদেরই। সভাপতি নীতিন হলেও দলের নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি যে অন্য হাতেই রয়েছে, তা এখন স্পষ্ট।
















