রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের ব্রিয়ানস্ক এলাকায় ইউক্রেন সীমান্তঘেঁষা একটি রেলপথে সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এই রেলপথ দিয়েই সামনের সারিতে রুশ সেনাদের অস্ত্র ও রসদ পাঠানো হচ্ছিল। পরে জানা যায়, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; নিকটবর্তী একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল।
এই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে ইউক্রেনপন্থী গোপন প্রতিরোধ গোষ্ঠী আতোশ। সংগঠনটি জানায়, শত্রুপক্ষের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করেই তারা আঘাত হানে, যাতে সামনের সারির পেছনের সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলে রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার চেষ্টা চালালেও সামনের যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি পেছন দিক থেকেও ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের মুখে পড়ছে রুশ বাহিনী। এসব গোপন প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রিমিয়ান তাতারদের নেতৃত্বাধীন আতোশকে সবচেয়ে সক্রিয় বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনটির দাবি, গত বছর রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সংঘটিত নাশকতার অর্ধেকের বেশি ঘটনার সঙ্গে তারা জড়িত।
সংগঠনটির এক সমন্বয়কারী জানান, বর্তমানে এই সংঘাত ধীরে ধীরে ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ভূমিকা ক্রমেই নির্ণায়ক হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, দখলদার বাহিনী তাদের পেছনের প্রতিটি ট্রাক বা রেললাইনের প্রতিটি মিটার পাহারা দিতে পারে না।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর আতোশ গঠিত হয়। সংগঠনটির মূল শক্তি ক্রিমিয়ান তাতার জনগোষ্ঠী হলেও এতে ইউক্রেনীয়দের পাশাপাশি কিছু রুশ ও বেলারুশ নাগরিকও যুক্ত রয়েছে বলে তারা দাবি করেছে। সংগঠনটির মতে, কেবল বাইরের শক্তির অপেক্ষায় না থেকে দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে ভেতর থেকেই দখলদারদের জন্য বিপজ্জনক করে তুলতে হবে।
সংগঠনটি বলছে, তাদের লক্ষ্য রাশিয়ার সামরিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দেওয়া। এজন্য তারা রসদপথ, সামরিক ঘাঁটি, সেতু ও গোলাবারুদ মজুতকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করে। তাদের দাবি, মাঠপর্যায়ের গুপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই এসব অভিযান পরিকল্পনা করা হয় এবং নিজেদের সদস্যদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
নাশকতার পাশাপাশি আতোশ বিভিন্ন শহরে লিফলেট ও বার্তা ছড়িয়ে প্রচারণা চালায় এবং সামরিক স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছে দেয় বলে জানায়। সংগঠনটির দাবি, তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ২০২৩ সালে সফল হামলার পর রাশিয়াকে কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহর স্থানান্তর করতে বাধ্য হতে হয়েছিল।
আতোশ জানায়, তারা বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোতে কাজ করে যাতে নিরাপত্তা সংস্থার অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়। একেকটি ছোট দল আলাদাভাবে কাজ করে এবং সদস্যরা পরস্পরের পরিচয় জানে না। এমনকি রুশ সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার ভেতরেও তাদের সমর্থক রয়েছে বলে সংগঠনটির দাবি।
সংগঠনটি আরও জানায়, ২০২৩ সালের মধ্যে তারা চার হাজার রুশ সেনাকে যুদ্ধ থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে নিজেদের সরঞ্জাম অকার্যকর করার প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব নাশকতা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বড় প্রভাব না ফেললেও ধীরে ধীরে রাশিয়াকে বাড়তি নিরাপত্তা, মেরামত ও নজরদারিতে বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য করছে।
তবে এই প্রতিরোধের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। রাশিয়া ও দখলকৃত অঞ্চলে ইউক্রেনের প্রতি সামান্য সমর্থন প্রকাশ করাও বিপজ্জনক। সন্দেহ হলেই মানুষকে গ্রেপ্তার বা গুম করা হচ্ছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে।
তারপরও প্রতিরোধ থামছে না। আতোশের এক সদস্য বলেন, তাদের কাছে এই লড়াই ব্যক্তিগত। তাদের ভূমিতে শেষ দখলদার না থাকা পর্যন্ত এই আগুন জ্বলতেই থাকবে।
ক্রিমিয়ান তাতাররা একটি তুর্কি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দমন-পীড়নের শিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পুরো জনগোষ্ঠীকে মধ্য এশিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারান। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর আবারও তারা নিপীড়নের মুখে পড়ে, বহু মানুষ বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। এই ইতিহাসই আজকের প্রতিরোধ আন্দোলনের পেছনে বড় প্রেরণা হয়ে উঠেছে।
















