আগ্রাসী ‘প্রাইস ডাম্পিং’ ও সীমান্তে ওয়্যারহাউস নির্মাণ; ধ্বংসের মুখে দেশীয় টেক্সটাইল খাত
বাংলাদেশের দেশীয় বস্ত্র খাতের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ এখন ভারতীয় আগ্রাসী বাণিজ্যিক নীতির কারণে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভারত থেকে আসা সস্তা সুতা ও নিম্নমানের কাপড়ের কারণে দেশীয় বস্ত্রকলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত হাসিনা সরকারের আমলে ভারতকে সুবিধা দিতে সীমান্তে অর্ধশতাধিক ওয়্যারহাউস বা গুদাম নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যা এখন দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২১ জানুয়ারি ২০২৬-এর বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশই ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে। ২০২২ সালে যেখানে ভারত ৪২৯ মিলিয়ন ডলারের সুতা রপ্তানি করেছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২.২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত সরকারি ভর্তুকি দিয়ে ভারত ‘প্রাইস ডাম্পিং’-এর (উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি) মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিচ্ছে।
সংকটের নেপথ্যে প্রধান কারণসমূহ:
- আগ্রাসী প্রাইস ডাম্পিং: বর্তমানে ভারতীয় সুতা প্রতি কেজি ২.১৯ ডলারে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে দেশীয় মিলগুলোর উৎপাদন খরচই ২.৩৯ ডলার। ভারত তাদের রপ্তানিকারকদের ৩.৮৮ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ভর্তুকি দিচ্ছে।
- সীমান্তে ওয়্যারহাউস সিন্ডিকেট: বাংলাদেশের সুতার বাজার একচেটিয়া দখলে নিতে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশ সীমান্তের চারটি স্থলবন্দরের কাছে অন্তত ৫০টি ওয়্যারহাউস স্থাপন করেছে। এতে তাদের ‘লিডটাইম’ বা পণ্য সরবরাহের সময় অনেক কমে গেছে।
- ভর্তুকি প্রত্যাহার: বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পরামর্শে গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ থেকে দেশীয় বস্ত্র খাতের সুরক্ষা সুবিধা (ভর্তুকি) প্রায় বন্ধ করে দেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, যা দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে।
- নিম্নমানের সুতার প্রভাব: ভারত থেকে আসা সস্তা ও নিম্নমানের সুতায় তৈরি পোশাক অনেক সময় ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে ‘রিজেক্ট’ হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
উদ্যোক্তাদের শঙ্কা ও বর্তমান পরিস্থিতি:
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| বিপন্ন বিনিয়োগ | প্রায় ৫২৭টি সুতাকল ও ৯৯৪টি কাপড় কারখানা (মোট ২৫ বিলিয়ন ডলার)। |
| সুতা আমদানির চিত্র | ২০২৪ সালে মোট ৩.২৬ বিলিয়ন ডলারের সুতা ও ফাইবার আমদানি। |
| বন্ধ হওয়া কারখানা | গত তিন বছরে ৩০টির বেশি টেক্সটাইল মিল পুরোপুরি বন্ধ। |
| মূল্য বৈষম্য | ভারতীয় সুতা প্রতি কেজিতে দেশীয় সুতার তুলনায় ২০-৩০ সেন্ট সস্তা। |
সমাধানের পথে অমিল:
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের ভারতীয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে, যাকে স্বাগত জানিয়েছে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ। তবে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ মনে করছে, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই দেশীয় শিল্প পুরোপুরি বিদেশি শক্তির দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
















