সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ; সংকটে পড়ার শঙ্কায় আরএমজি খাত
দেশীয় স্পিনিং মিল বা বস্ত্রকলগুলোকে সুরক্ষা দিতে ভারত থেকে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশের শীর্ষ দুই রপ্তানি খাত—তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) ও বস্ত্রকল (BTMA) মালিকরা এখন মুখোমুখি অবস্থানে। পোশাক রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। অন্যদিকে, বস্ত্রকল মালিকদের দাবি, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার না করলে দেশীয় সুতা শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
২১ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দিষ্ট কাউন্টের সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে। যদিও এনবিআর এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবে এই ইস্যু নিয়ে বিজিএমইএ-বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ-র মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে।
উভয় পক্ষের প্রধান যুক্তি ও শঙ্কা:
- তৈরি পোশাক শিল্প (বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ): সংগঠন দুটির দাবি, বিশ্ববাজারের মন্দা ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে সুতা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করলে রপ্তানি আদেশ কমবে। বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান জানান, গত ডিসেম্বর মাসে পোশাক রপ্তানি ১৪.২৩% কমেছে; এই অবস্থায় উচ্চ মূল্যে সুতা কিনতে বাধ্য করা হলে শিল্প গভীর সংকটে পড়বে।
- বস্ত্রকল শিল্প (বিটিএমএ): বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, ভারত সরকার সুতা রপ্তানিতে ভর্তুকি দেওয়ায় তারা কম দামে বাংলাদেশে সুতা ডাম্পিং করছে। এতে স্থানীয় প্রায় ১০০টি টেক্সটাইল মিল বন্ধের পথে। দেশীয় শিল্প রক্ষায় শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা বাতিল করা অপরিহার্য।
- মূল্যের পার্থক্য: বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সুতার দাম প্রতি কেজি $২.৭০-$২.৭৫, যেখানে আমদানিকৃত ভারতীয় সুতার দাম পড়ছে $২.৫৫-$২.৬০।
এক নজরে সুতা আমদানির বর্তমান সংকট:
| বিষয় | পোশাক শিল্প মালিকদের অবস্থান | বস্ত্রকল মালিকদের অবস্থান |
| মূল দাবি | বন্ড সুবিধা বহাল রাখা। | বন্ড সুবিধা বাতিল করা। |
| আশঙ্কা | উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আদেশ হারানো। | স্থানীয় মিল বন্ধ হওয়া ও কর্মসংস্থান হারানো। |
| বিকল্প প্রস্তাব | আমদানিতে শুল্ক না বসিয়ে সুতা খাতে নগদ সহায়তা দেওয়া। | দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। |
| বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মত | আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা প্রয়োজন। | স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। |
সিদ্ধান্তের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ:
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে, নির্দিষ্ট কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করলে দেশীয় স্পিনিং শিল্পে ভারসাম্য ফিরবে এবং নিট পোশাক খাত ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা থেকে মুক্তি পাবে। তবে তৈরি পোশাক মালিকরা বলছেন, জোর করে দেশীয় সুতা কিনতে বাধ্য না করে বরং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে মিলগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। এনবিআর এখন উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি মধ্যবর্তী সমাধানের পথে হাঁটবে কি না, তা-ই দেখার বিষয়।
















