ওয়াশিংটন — যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে খুব কম প্রেসিডেন্টই দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এত দ্রুত ও ব্যাপক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এক বছরে দুই শতাধিক নির্বাহী আদেশ, এক হাজার সাতশর বেশি ক্ষমা ও দণ্ড মওকুফ এবং অন্তত সাতটি বিদেশি দেশে প্রাণঘাতী সামরিক হামলা—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুটা ছিল অভূতপূর্ব গতিময়।
ইতিহাসবিদরা বলছেন, এই দ্রুতগতির শাসনপ্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে এবং দেশটিকে নজিরবিহীন প্রেসিডেন্টকেন্দ্রিক ক্ষমতার যুগে ঠেলে দিয়েছে। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার সেন্টারের অধ্যাপক রাসেল রাইলির মতে, ফেডারেল সরকারের বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে সাজানোই ছিল এই মেয়াদের মূল লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, গতি ও ব্যাপ্তির দিক থেকে দেখলে ট্রাম্পের শাসনকালকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে কম রক্ষণশীল প্রেসিডেন্সিগুলোর একটি বলা যেতে পারে।
রাইলি বলেন, দ্রুত কাজ করা এবং প্রয়োজনে ভাঙচুর করা—এই কৌশল তাদের কাছে আকর্ষণীয়, যারা মনে করেন বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি অকার্যকর বা দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁর মতে, এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধকালের সেই কথার আধুনিক রূপ, যেখানে বলা হতো, গ্রাম বাঁচাতে হলে গ্রাম ধ্বংস করতেও হতে পারে।
তবে এই গতি আকস্মিক ছিল না। ২০১৮ সালেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন গণমাধ্যম ও জনমতকে একসঙ্গে নানা ঘটনার চাপে ব্যস্ত রাখার কৌশলের কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, একদিকে যখন সংবাদমাধ্যম একটি বিষয়ে মনোযোগ দেবে, তখন অন্যদিকে দ্রুতগতিতে সব কাজ সেরে ফেলা যাবে।
ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝখানের চার বছরের বিরতিও এই কৌশল বাস্তবায়নে সহায়ক হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এই সময়েই তাঁর ঘনিষ্ঠরা দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বিশদ নীতিগত নকশা তৈরি করেন, যার মধ্যে ছিল প্রজেক্ট ২০২৫ নামের দীর্ঘ নীতিপত্র।
ইতিহাসবিদ মার্ক আপডেগ্রোভ মনে করিয়ে দেন, নতুন মেয়াদ শুরুতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একেবারে নতুন নয়। তিনি ১৯৩২ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের প্রথম মেয়াদের উদাহরণ টানেন, যখন মহামন্দার প্রেক্ষাপটে দ্রুতগতিতে বড় সংস্কার আনা হয়েছিল। তবে তাঁর মতে, ট্রাম্পের সময়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিবর্তনের মাত্রা এতটাই বড় যে আগের কোনো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি তুলনা চলে না।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নির্বাহী আদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনেই তিনি রেকর্ড সংখ্যক আদেশে সই করেন। এক বছরের মধ্যেই এই আদেশের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে তাঁর প্রথম মেয়াদের পুরো চার বছরের হিসাবকে। আপডেগ্রোভের মতে, এটি ট্রাম্পের ব্যবসায়ী মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে বোর্ড বা শেয়ারহোল্ডারের জবাবদিহি করতে হতো না।
তবে এই একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা মূলত ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে কংগ্রেস ও আদালত নির্বাহী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া সহজ হওয়ায় ট্রাম্প সেই পথেই বেশি এগিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আদালত ও কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের প্রাধান্য থাকায় ট্রাম্প এই মেয়াদে তুলনামূলক কম বাধার মুখে পড়েছেন। ফলে নির্বাহী ক্ষমতার সীমা আরও প্রসারিত হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনগুলোর সবই যে দীর্ঘস্থায়ী হবে, এমন নয়। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে, যেখানে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে যেতে পারে। তাতে ট্রাম্পের অনেক সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ প্রশাসন সহজেই বাতিল করতে পারবে বলে ধারণা ইতিহাসবিদদের।
তবুও আপডেগ্রোভ সতর্ক করে বলেন, দ্রুতগতির এই শাসনের কিছু প্রভাব এখনো চোখে পড়ছে না। ব্যাপক ছাঁটাইয়ের ফলে সরকারি দপ্তরে যে অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান হারিয়ে গেছে, তার দীর্ঘমেয়াদি ফল ভোগ করতে হতে পারে দেশকে।
সবশেষে তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করতে পারে অর্থনীতির ওপর। মূল্যস্ফীতি কমানো ও জীবনযাত্রার খরচ হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিলেও সাধারণ মানুষ এখনো তেমন পরিবর্তন অনুভব করছেন না। তাঁর মতে, গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগের চেয়েও দৈনন্দিন পণ্যের দামের চাপই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পবাদের গতি থামাতে পারে।
















