জাহাজ চলাচল কমে বেড়েছে বন্দরজট ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়
রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং না হওয়ায় ৬.৫ মিটারে নেমেছে চ্যানেলের গভীরতা
নাব্যতা সংকটে কার্যত অচল অবস্থার দিকে এগোচ্ছে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। রাবনাবাদ চ্যানেলে অতিরিক্ত পলি জমে যাওয়ায় বড় জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জাহাজগুলোকে ঘুরে চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে হচ্ছে, যা বন্দরজট বাড়ানোর পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পায়রা বন্দরে এসেছে মাত্র ১৭টি বিদেশি মাতৃজাহাজ। যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১১১টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২৩টি জাহাজ। অথচ বড় জাহাজ চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে মূলধন ড্রেজিংয়ে ব্যয় করা হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানান, রাবনাবাদ চ্যানেলে পলি জমে নাব্যতা নেমে এসেছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিটারে, যেখানে নকশা অনুযায়ী গভীরতা থাকার কথা ছিল ১০ দশমিক ৫ মিটার। ফলে বড় আকারের জাহাজ বন্দরে ঢুকতে পারছে না।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডে। এসব কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহকারী জাহাজ এখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করছে। পরে ছোট লাইটার জাহাজে করে কয়লা পায়রায় আনা হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ইউনিটপ্রতি প্রায় ৭০ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ–এর হারবার ও মেরিন বিভাগের সদস্য মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মূলধন ড্রেজিংয়ের পরপরই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় পলি জমে নাব্যতা কমে গেছে। ফলে ৮ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ আর বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না।
তিনি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন করে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দুটি আধুনিক ড্রেজার সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচনকালীন সময় ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনুমোদন বিলম্বিত হচ্ছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শাখাও জানিয়েছে, ড্রেজিং প্রস্তাব সময়মতো না আসায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নতুন করে প্রস্তাব প্রণয়ন করতে সময় লাগবে।
বন্দর চালুর পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পায়রা বন্দরে মোট ৫ হাজার ৩৩৮টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার মধ্যে ৫৪৪টি বিদেশি। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। তবে বিদেশি জাহাজ কমে যাওয়ায় আয় কমছে। ড্রেজিং ব্যয় মেটাতে বড় দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর বার্ষিক ৭০০ কোটি টাকা লেভি আরোপের প্রস্তাবও দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
২০১৩ সালে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করা পায়রার কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন শেষে বন্দরটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার কথা থাকলেও ড্রেজিং সংকটে সেই সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
















