রাবাতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ২০২৫-এর ফাইনাল ম্যাচটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্য এক বিব্রতকর অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। স্বাগতিক মরক্কোর বিপক্ষে সেনেগালের ১-০ গোলের জয় ছাপিয়ে গেছে মাঠের ভেতর ও বাইরের বিশৃঙ্খলা, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।
উচ্চমানের দুই দলের লড়াই হিসেবে যে ম্যাচটি প্রত্যাশা জাগিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় অরাজকতায়। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে স্কোরলাইন ছিল ০-০। যোগ করা সময়ে সেনেগালের ইসমাইলা সার একটি গোল করলেও রেফারি জাঁ জাক ন্দালা সেটি বাতিল করেন। তাঁর সিদ্ধান্তে বলা হয়, গোলের আগে আবদুলায়ে সেক মরক্কোর ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমিকে ফাউল করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও।
এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে মরক্কোর তারকা ব্রাহিম দিয়াজ বক্সে পড়ে গিয়ে পেনাল্টির আবেদন করেন। ভিএআর পর্যালোচনার পর বিতর্কিতভাবে মরক্কোর পক্ষে পেনাল্টি দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় কোচ ও খেলোয়াড়দের ধস্তাধস্তিতে রেফারিকেও বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
এই পেনাল্টির প্রতিবাদে থিয়াও তাঁর দলকে মাঠ ছাড়তে নির্দেশ দেন। খেলোয়াড়রা টানেলে চলে গেলে ম্যাচ থেমে যায় প্রায় ১৭ মিনিট। এর মধ্যে দর্শকদের একটি অংশ মাঠে বস্তু নিক্ষেপ করে এবং কয়েকজন সমর্থক মাঠেও ঢুকে পড়ে। পরে থিয়াও স্বীকার করেন, দলকে মাঠ ছাড়তে বলা ঠিক হয়নি, তবে ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
শেষ পর্যন্ত খেলা শুরু হলে পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান ব্রাহিম দিয়াজ। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে তিনি পানেনকা শটে বল তুলে মারতে গিয়ে সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্দির হাতে তুলে দেন বল। ষাট হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত থাকা স্টেডিয়ামে তখন হতাশার নীরবতা নেমে আসে।
এরপর অতিরিক্ত সময়ে সেনেগালের পাপে গেয়ি দারুণ এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। সেই গোলই শেষ পর্যন্ত শিরোপা নির্ধারণ করে দেয়। সেনেগাল দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন হয়। খেলায় তারা প্রাপ্য জয় পেলেও পুরো ফাইনাল ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক উদযাপনকে আড়াল করে দেয়।
ম্যাচ শেষে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঠের কুৎসিত দৃশ্যের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এভাবে মাঠ ছাড়াকে মেনে নেওয়া যায় না এবং ফুটবলে সহিংসতার কোনো স্থান নেই। রেফারির সিদ্ধান্ত সম্মান করাও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আফ্রিকান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএএফ থেকে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মরক্কো কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই ঘটনাগুলোকে লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এসব আফ্রিকার সম্মান বাড়ায় না। সেনেগাল কোচ থিয়াওয়ের বিরুদ্ধেও তদন্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
ফাইনালের আগে সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ম্যাচ পরিচালনায় রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। সেনেগালের বাতিল গোল এবং মরক্কোর পেনাল্টি দুটিই অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হয়েছে।
স্বাগতিক পক্ষপাতের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও মরক্কো আয়োজনের দিক থেকে প্রশংসা পেয়েছিল, ফাইনালের ঘটনাবলি সেই সুনামকে আঘাত করেছে। কান্নাভেজা চোখে স্টেডিয়াম ছাড়েন মরক্কোর সমর্থকেরা, যাদের দীর্ঘদিনের শিরোপা স্বপ্ন আবারও অধরাই থেকে গেল।
শেষ পর্যন্ত সেনেগালের জয় যেমন ইতিহাস গড়েছে, তেমনি রাবাতের ফাইনাল আফ্রিকান ফুটবলের জন্য রেখে গেছে এক অস্বস্তিকর স্মৃতি। এখন সিএএফের শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
















