ওয়াশিংটন: ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির এক বছর পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আপাতদৃষ্টিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ভালো, বেকারত্বও নিয়ন্ত্রণে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর কাঠামোগত সমস্যা এবং ধনী ও সাধারণ মানুষের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে।
গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন নানা ধরনের নীতি ও শুল্ক আরোপ করেছে, যা ব্যবসা, সরবরাহ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন এনেছে। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে, উৎপাদন কমবে এবং বেকারত্ব বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি ঘটেনি।
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি। বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ইয়ারোস বলেন, যেভাবে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। তিনি জানান, অনেক দেশের পক্ষ থেকে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা না নেওয়া এবং শেয়ারবাজারের উত্থান পরিস্থিতিকে সামলে রেখেছে।
এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ব্যাপক শুল্ক ঘোষণার পর প্রযুক্তি খাতনির্ভর শেয়ারবাজার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে কাগজে কলমে আমেরিকানদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে এবং ভোক্তা ব্যয়ও বাড়তে শুরু করেছে। গবেষণা অনুযায়ী, মহামারির পর ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির প্রায় এক তৃতীয়াংশ এসেছে সম্পদমূল্য বাড়ার কারণে।
তবে এই লাভ সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়নি। মুডিস অ্যানালিটিকস জানিয়েছে, বর্তমানে শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়কারী মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করছে, যা ১৯৮৯ সালের পর সর্বোচ্চ।
পিটারসন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্কাস নোল্যান্ড বলেন, উচ্চ আয়ের মানুষ ও প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মীরাই মূলত এই প্রবৃদ্ধির সুফল পাচ্ছেন। কিন্তু এই পরিসংখ্যান প্রকৃত বৈষম্য আড়াল করে রাখছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না বললেই চলে। আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্য খাতে কিছু নিয়োগ হলেও খুচরা ব্যবসা, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে চাকরি কমেছে। এসব খাতে মূলত অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক বহিষ্কার অভিযান ও অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর অন্তত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিট অভিবাসন হ্রাস পেয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এর ফলে চলতি বছরে শ্রমবাজার থেকে প্রায় ২০ লাখ কর্মী কমে যেতে পারে।
নোল্যান্ড বলেন, বহিষ্কারের কড়া পদ্ধতির কারণে শুধু অবৈধ অভিবাসনই নয়, বৈধ অভিবাসীরাও ভীত হয়ে পড়েছেন। এতে শ্রমবাজার আরও সংকুচিত হচ্ছে।
ছোট ব্যবসাগুলোর ওপরও চাপ বেড়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানের মতো তারা পণ্য মজুত বা সরবরাহকারীদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারছে না। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস জানায়, নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ছোট প্রতিষ্ঠানের ওপর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। চিপ উৎপাদন ও ক্লাউড সেবার মতো মূলধননির্ভর খাতেই আয় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। বার্নার্ড ইয়ারোস বলেন, মানুষ অর্থনীতি নিয়ে স্বস্তি না পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে চাকরি বাড়ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি শ্রমবাজারে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বাইরে থেকে শক্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে বৈষম্য, কর্মসংস্থান সংকট এবং অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
















